আপনার স্বভাবে কৃপণতা আছে কি? পরিণাম জানুন–শীর্ষবার্তা ডটকম

2 184

আপনার স্বভাবে কৃপণতা আছে কি? পরিণাম জানুন
দীদার মাহদী

কৃপণতা ভালো কোনো গুণ নয় ৷ কৃপণ ব্যক্তিকে সমাজ ভালো চোখে দেখে না ৷ ঘৃণার পাত্র হয় সে ৷ এরা লোক সমাজে হয় নিন্দিত এবং উপহাসের পাত্র ৷ কৃপণ শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যয়কুন্ঠ, কিপটে এবং কঞ্জুস ৷ খরচ না করে কেবল জমাতে চায় এমন লোক ৷ দানের বিপরীত বলা চলে কৃপণতাকে ৷

অপচয় শব্দটির সাথেও আমরা বেশ পরিচিত ৷ অপচয় করা এবং কৃপণতা পরিভাষা দু’টি আমাদের সমাজে একটি অপরটির বিপরীত অর্থে বহুল প্রচলিত ৷ এ দু’টির কোনোটিরই আমরা পছন্দ করি না ৷ কিন্তু অজান্তেই আবার এর সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলি ৷ কারণে-অকারণে আবার সেগুলোকে বৈধ ও ভালো বলে ছাফাই গাইতেও কুণ্ঠাবোধ করি না ৷

ইসলাম পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে তার অবস্থানকে এ দুই পরিভাষার মধ্যবর্তী স্থানে নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ ইসলাম অপচয়কে যেমন প্রশ্রয় দেয় না, তেমনি কৃপণতারও সুযোগ এতে নেই ৷ এ অবস্থানটি যৌক্তিক এবং একে অন্যের জন্য কল্যাণকরও ৷

মহান আল্লাহ মানুষকে সম্পদ দিয়েছেন ৷ তিনিই আবার এ সম্পদ থেকে দান করতে বলেছেন ৷ যাকাত আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন ৷ দিয়েছেন ধনীদের সম্পদে গরীবের হকও ৷ কিন্তু সম্পদশালীরা হাত গুটিয়ে নিচ্ছে ৷ কষ্টার্জিত অর্থ দান না করে কুক্ষিগত করে রাখছে ৷ এমনকি বহু কৃপণ রয়েছে যে তার পরিবারেও প্রয়োজন অনুপাতে খরচ করে না ৷

অথচ কুরআন বলছে,
الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ وَ یَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبُخۡلِ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّ فَاِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡغَنِیُّ الۡحَمِیۡدُ ﴿۲۴﴾
‘যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয়, আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত আল্লাহ নিশ্চয় অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত।’
[সূরা হাদীদ, আয়াত ২৪]

কুরআন আরো বলেছে,
ہٰۤاَنۡتُمۡ ہٰۤؤُلَآءِ تُدۡعَوۡنَ لِتُنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۚ فَمِنۡکُمۡ مَّنۡ یَّبۡخَلُ ۚ وَ مَنۡ یَّبۡخَلۡ فَاِنَّمَا یَبۡخَلُ عَنۡ نَّفۡسِہٖ ؕ وَ اللّٰہُ الۡغَنِیُّ وَ اَنۡتُمُ الۡفُقَرَآءُ ۚ وَ اِنۡ تَتَوَلَّوۡا یَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَیۡرَکُمۡ ۙ ثُمَّ لَا یَکُوۡنُوۡۤا اَمۡثَالَکُمۡ ﴿٪۳۸﴾

‘তোমরাই তো তারা, তোমাদের আহবান করা হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। অথচ তোমাদের কেউ কেউ কার্পণ্য করছে। তবে যে কার্পণ্য করছে সে তো নিজের প্রতিই কার্পণ্য করছে। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের ছাড়া অন্য কোন কওমকে স্থলাভিষিক্ত করবেন। তারপর তারা তোমাদের অনুরূপ হবে না ৷’
[সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ৩৮]

কৃপণের বৈশিষ্ট্য : কৃপণ ব্যক্তির মন এতই সংকীর্ণ যে, তার কাছে আল্লাহর রহমতের আশার চেয়ে তার সঞ্চিত সম্পদ শেষ হয়ে যাবে সেই আশংকাই প্রবল ৷ যদ্দরুণ দেখা যায় নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত খরচ করেনা ৷ আর দানের বেলায় তো তার মন চায়ই না ৷ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা স্পষ্ট জানিয়ে দেন:

قُلۡ لَّوۡ اَنۡتُمۡ تَمۡلِکُوۡنَ خَزَآئِنَ رَحۡمَۃِ رَبِّیۡۤ اِذًا لَّاَمۡسَکۡتُمۡ خَشۡیَۃَ الۡاِنۡفَاقِ ؕ وَ کَانَ الۡاِنۡسَانُ قَتُوۡرًا ﴿۱۰۰﴾٪

বল, ‘যদি তোমরা আমার রবের রহমতের ভান্ডারসমূহের মালিক হতে, তবুও খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা তা আটকে রাখতে; আর মানুষ তো অতি কৃপণ’।
[সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ১০০]

কুরআন আরো জানায়,
وَ اَعۡطٰی قَلِیۡلًا وَّ اَکۡدٰی ﴿۳۴﴾
আর সামান্য দান করে, তারপর বন্ধ করে দেয় ৷
[সূরা নজম, আয়াত ৩৪]

কৃপণের পরিণাম : কৃপণের পরিণাম ভয়াবহ ৷ দুনিয়া ও আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৷ দুনিয়াতে আছে লাঞ্চনা ৷ আখিরাতে ভয়ানক শাস্তি ৷
কুরআন বলছে,
ۣالَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ وَ یَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبُخۡلِ وَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اٰتٰہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَ اَعۡتَدۡنَا لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابًا مُّہِیۡنًا ﴿ۚ۳۷﴾

যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয়; আর গোপন করে তা, যা আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। আর আমি প্রস্তুত করে রেখেছি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর আযাব।’
[নিসা-৩৭]

কুরআন বলছে,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡاَحۡبَارِ وَ الرُّہۡبَانِ لَیَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ وَ یَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ یَکۡنِزُوۡنَ الذَّہَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَہَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ فَبَشِّرۡہُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ﴿ۙ۳۴﴾

‘হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পন্ডিত ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও।’
[সূরা তওবা, আয়াত ৩৪]
ইরশাদ হচ্ছে,

وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ہُوَ خَیۡرًا لَّہُمۡ ؕ بَلۡ ہُوَ شَرٌّ لَّہُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِہٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰہِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ﴿۱۸۰﴾٪

আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।’
[আল-ইমরান-১৮০]
আরো ইরশাদ হচ্ছে,
یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡہَا فِیۡ نَارِ جَہَنَّمَ فَتُکۡوٰی بِہَا جِبَاہُہُمۡ وَ جُنُوۡبُہُمۡ وَ ظُہُوۡرُہُمۡ ؕ ہٰذَا مَا کَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِکُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا کُنۡتُمۡ تَکۡنِزُوۡنَ ﴿۳۵﴾

যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর’।
[তওবা-৩৫]

তাই নয় কুরআন আরো বলছে,
تَدۡعُوۡا مَنۡ اَدۡبَرَ وَ تَوَلّٰی ﴿ۙ۱۷﴾
وَ جَمَعَ فَاَوۡعٰی ﴿۱۸﴾
‘জাহান্নাম তাকে ডাকবে যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ।
আর সম্পদ জমা করেছিল, অতঃপর তা সংরক্ষণ করে রেখেছিল।’
[মাআরিজ ১৭-১৮]

কুরআন আরো বলছে,
وَیۡلٌ لِّکُلِّ ہُمَزَۃٍ لُّمَزَۃِۣ ۙ﴿۱﴾ الَّذِیۡ جَمَعَ مَالًا وَّ عَدَّدَہٗ ۙ﴿۲) یَحۡسَبُ اَنَّ مَالَہٗۤ اَخۡلَدَہٗ ۚ﴿۳﴾ کَلَّا لَیُنۡۢبَذَنَّ فِی الۡحُطَمَۃِ ۫﴿ۖ۴﴾
‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী।
যে সম্পদ জমা করে এবং বার বার গণনা করে।
সে মনে করে তার সম্পদ তাকে চিরজীবি করবে।
কখনো নয়, অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামা’য়।’
[হুমাযা: ১-৪]

শয়তানের কাজ : কৃপণতা হচ্ছে শয়তানের কুমন্ত্রণার ফল। সে মানুষের অন্তরে সম্পদের মোহ সৃষ্টি করে ৷ দারিদ্রের ভয় প্রকট করে তোলে ৷ এ প্রসঙ্গে কুরআন বলছে,

اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَ یَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ ۚ وَ اللّٰہُ یَعِدُکُمۡ مَّغۡفِرَۃً مِّنۡہُ وَ فَضۡلًا ؕ وَ اللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۶۸﴾ۖۙ

‘শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’
[বাকারা-২৬৮]

কৃপণের সম্পদ কোন কাজে আসবে না :
কৃপণ ব্যক্তি কৃপণতা করে যে সম্পদ জমা করেছে দিনশেষে তা কোনো কাজেই লাগবে না ৷ ধ্বংস হয়ে যাবে ৷ পবিত্র কুরআন বলছে,

وَ اَمَّا مَنۡۢ بَخِلَ وَ اسۡتَغۡنٰی ۙ﴿۸﴾وَ کَذَّبَ بِالۡحُسۡنٰی ۙ﴿۹﴾ فَسَنُیَسِّرُہٗ لِلۡعُسۡرٰی ﴿ؕ۱۰﴾ وَ مَا یُغۡنِیۡ عَنۡہُ مَا لُہٗۤ اِذَا تَرَدّٰی ﴿ؕ۱۱﴾
আর যে কার্পণ্য করেছে এবং নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে, আর উত্তমকে মিথ্যা বলে মনে করেছে, আমি তার জন্য কঠিন পথে চলা সুগম করে দেব। আর তার সম্পদ তার কোন কাজে আসবে না, যখন সে অধঃপতিত হবে।
[সূরা লাইল: ৮-১১]

সফলতার শর্তাবলী :
মানুষের জীবন ও সম্পদ সম্পর্কে পরীক্ষা করা হবে বলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি বরং বাতলে দিয়েছেন পরীক্ষা পাশের গাইড লাইনও। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের বাণী,
فَاتَّقُوا اللّٰہَ مَا اسۡتَطَعۡتُمۡ وَ اسۡمَعُوۡا وَ اَطِیۡعُوۡا وَ اَنۡفِقُوۡا خَیۡرًا لِّاَنۡفُسِکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یُّوۡقَ شُحَّ نَفۡسِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۱۶﴾
অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শ্রবণ কর, আনুগত্য কর এবং তোমাদের নিজদের কল্যাণে ব্যয় কর, আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই মূলত সফলকাম।
[তাগাবুন-১৬]

- Advertisement -