- Advertisement -

- Advertisement -

দুঃখ, কষ্ট ও দুশ্চিন্তাকে দীর্ঘস্থায়ী করবেন না— আরিফ আজাদ

2 211

চলমান সময়ে পরিচিত মুখ ৷ বইমেলায় যার বই সর্বাধিক বিক্রি হয়েছে ৷ আরিফ আজাদ যার নাম ৷ আজ ফেসবুকে চমৎকার একটি পোস্ট দেন তিনি ৷ শীর্ষবার্তা ডটকমের পাঠকদের জন্য আমরা তা হুবহু নিয়ে এলাম ৷ পড়ুন তার ভাষায়—
একটা গল্প প্রচলিত আছে। একজন মনোবিজ্ঞানী ক্লাশে ঢুকে একটি গ্লাস হাতে নিলেন যা অর্ধেকটা খালি এবং বাকি অর্ধেক পানিতে ভর্তি। ক্লাশের সবাই ভাবলো, উনি বোধহয় জিজ্ঞেস করবেন যে, এই গ্লাস ভর্তি না খালি? এটাই পপুলার জিজ্ঞাসা এই ইস্যুতে। কিন্তু তিনি তা জিজ্ঞেস করলেন না। তিনি বললেন, ‘এই গ্লাসের ওজন কতো হতে পারে?’

সবাই খানিকটা বিস্মিত হলো। অনেকে অনেকরকম উত্তর দিলো অবশ্য। পরে, মনোবিজ্ঞানী নিজেই বললেন যে, এই গ্লাসের ওজন, পানি সহ চারশো গ্রাম।

এরপর তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, এই যে আমি চারশো গ্রামের এই গ্লাস ধরে আছি, এতে কি আমার কষ্ট হচ্ছে?’

সবাই সমস্বরে উত্তর দিলো, ‘এ আর এমন কি ওজন যে, কষ্ট হবে?’

– ‘ঠিক। আমার কোন কষ্ট হচ্ছেনা। কিন্তু, এই গ্লাস যদি আমি একঘন্টা এভাবে ধরে রাখি, আমার কিন্তু কষ্ট হবে। যদি পাঁচ ঘন্টা ধরে রাখি, আরো বেশি কষ্ট হবে। যদি একদিন এভাবে ধরে রাখি এই গ্লাস, হতে পারে, আমার হাত প্যারালাইজড হয়ে যাবে’।

সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তিনি আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছেন কেউ-ই তা ধরতে পারছেনা।

আবার বলতে শুরু করলেন তিনি। ‘শোন, আমাদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা আর অস্থিরতাগুলোও ঠিক এরকম। আমরা যদি সেগুলোকে খুব সাময়িক সময়ের জন্য জীবনে স্থান দিই, তাহলে সেগুলো আমাদের কাছে খুব হালকা মনে হবে। যদি সেগুলোকে আমরা জীবনে দীর্ঘস্থায়ী করি, এই গ্লাস পাঁচ ঘন্টা বা একদিন এভাবে টানা ধরে রাখার মতো, তাহলে সেগুলো আমাদের জীবনকে তছনছ করে দেবে৷ ক্ষেত্রবিশেষে, আমাদের জীবনকে প্যারালাইজড করে ছাড়বে। তাই, জীবনের স্বার্থেই কোন দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা-অস্থিরতাকেই জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেওয়া যাবেনা। যতো দ্রুত পারা যায় সেগুলোকে ঝেঁটিয়ে জীবন থেকে বিদেয় করতে হবে’।

গল্পটা শেষ। কিন্তু, গল্পের শিক্ষাটা? আমি চিন্তা করে দেখলাম, গত কয়েকদিন বেশ অস্থিরতার মধ্যে কাটাচ্ছি৷ একটা চাপা চিন্তা, একটা চাপা ভয় যেন জীবনটাকে খুবলে খাচ্ছে। খেয়াল করে দেখলাম, এই চিন্তাগুলো আমার ওপর বেশিরভাগ চেপে বসেছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, যেমন- ফেইসবুক, টুইটার থেকে। আমি সারাদিন পৃথিবীর কোন প্রান্তে কতোজন করোনায় মরছে, কতোজন আক্রান্ত হচ্ছে এই আপডেটগুলো নিতে নিতে ক্লান্ত। ভেবে দেখলাম, আমার ভয়টা এখান থেকেই উদ্ভূত। এতো এতো মৃত্যু আর আক্রান্তের খবর দেখতে দেখতে আমিই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। একটা কাশি আসলেও মনে হচ্ছে আমার বুঝি করোনা হয়ে গেলো। একটু বুক ব্যথা করলেই শিউরে উঠছি। এই বুঝি গলা ব্যথাও শুরু হবে।

আসলে, আমার কি এতো ভয় পাওয়া উচিত?

আমার মা আর বাবা, যারা না ফেইসবুক বুঝেন, না টুইটার, না কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক৷ তারা জানে যে দেশে একটা মহামারি এসেছে। একটা ভাইরাস এসেছে। কি করতে হবে? সতর্ক থাকতে হলে যা যা করা দরকার তা তারা আমার কাছ থেকে বুঝে নিয়ে ওভাবে দিনযাপন করছেন। তারা মুহুর্তে মুহুর্তে মৃত আর আক্রান্তের খবরাখবর নেন না। ফলে, বাড়তি চিন্তাও নেই তাদের। নামাজ-কালাম করছেন। খাচ্ছেন। যিকির আযকার করছেন। ঘুমুচ্ছেন। নাতি-নাতনিদের সাথে খেলাধুলো করছেন। বেশ কেটে যাচ্ছে দিন। একটা সময় হয়তো, ইন শা আল্লাহ, তারা জানতে পারবে যে, দেশ থেকে করোনা দূর হয়েছে। বাড়তি চিন্তা না নিয়েও তারা দিন গুজরান করছেন। খুব ভালোভাবেই করছেন। সতর্কও থাকছেন। কিন্তু, অতিরিক্ত সতর্ক আর তথ্যের সাথে আপ টু ডেট থাকতে গিয়ে আমি নিজের জীবনটাকে অস্থির আর অস্বাভাবিক করে তুলেছি।

নাহ, আমার একটু মুক্তি দরকার। এভাবে আসলে হয় না। হতে পারেনা। দেশে করোনা এসেছে জানি। মানুষ মরছে তা-ও জানি৷ আর, এও জানি, করোনা থেকে বাঁচার জন্য সতর্কতার অংশ হিশেবে আমাকে আসলে কি কি করতে হবে। বেশি বেশি হাত ধুতে হবে। শরীরের ইমিউন সিস্টেম বাড়াতে হবে৷ মাস্ক-গ্লাভস পড়তে হবে বাইরে গেলে। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে চলতে হবে। সাধ্যমত গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই তো! আমার মনে হয়, এর বাইরে আর বেশিকিছু না জানলেও, করোনায় মৃত্যুর মুর্হুমুর্হু সংবাদ আর আক্রান্তের স্কোর না জানলেও আমার চলে যাবে। তাই, সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আর কোন সিরিয়াস আলাপ, সিরিয়াস ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ভাববো না। আপাতত সরল, স্বাভাবিক আর দুঃশ্চিন্তাহীন থাকতে চাই। জীবন থেকে, বাড়তি চাপ, বাড়তি চিন্তাকে দূর করতে চাই। চিন্তার গ্লাসটা বেশিক্ষণ হাতে রেখে হাতটাকে অসাড় করতে চাইনা।

কয়েকদিন আগে বাসায় সিঙ্গারা বানিয়েছি। আজ চিংড়ি শুঁটকি দিয়ে আলু রান্না এবং ডিম দিয়ে টমেটো ভাজি করলাম। সবাই একেবারে চেটেপুটে খেয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। সবাইকে এমন উৎফুল্লতার সাথে খেতে এর আগে কখনো দেখিনি। এই দুঃসময় আর দুঃসহ জীবনেও, আমার একটু সাংসারিক হওয়ার চেষ্টাটা কতো দারুনভাবেই না উপভোগ করলো আমার পরিবার। তাই, এখন থেকে সাংসারিক বিষয়াদিতে পুরোপুরি ঢুকে পড়তে চাই এই কয়েকদিন। অবসরে বই পড়া, লেখালেখি, লেকচার শোনা তো থাকবেই। সুতরাং, আজ থেকে নো বাড়তি চিন্তা। সতর্ক যা থাকার থাকি, কিন্তু অতিরিক্ত তথ্যের ভারে আর ন্যুজ হয়ে পড়তে চাইনা।