দুর্নীতি প্রতিরোধে ইসলামের ভূমিকা | দীদার মাহদী | শীর্ষবার্তা ডটকম

3 101

দীদার মাহদী ||

দুর্নীতি ৷ মানবসমাজের খারাপ একটি গুণ ৷ নীতিবিরুদ্ধ কাজই দুর্নীতি ৷ অন্যায়ভাবে সম্পদ উপার্জন ৷ কালোবাজারি ৷ ভেজালের চর্চা ৷ মানব বিধ্বংসী কাজ ৷ মোটকথা নীতি নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে অবৈধভাবে কোনো স্বার্থসিদ্ধিই দুর্নীতির আওতাভুক্ত ৷ পরীক্ষায় দুর্নীতি নকল বা প্রশ্নফাঁস ৷ এটা স্বাভাবিক সমাজ কামনা করে না ৷ তবুও দুর্নীতি থেমে নেই ৷ দুর্নীতিকে দমন করার জন্য কমিশন গঠিত হয়েছে ৷ ফলাফল হতাশাজনক! এ ফর্মূলায় দুর্নীতি থামানো সম্ভব নয় ৷ কারণ, সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে কে তাড়াবে শুনি! আজকাল সমাজের শ্রেষ্ঠ সন্তানরাও এই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে আছেন ৷ চোখে এমন রঙিন চশমা পড়েছেন যে, সব ঝকঝকা দেখছেন ৷

মানবজাতিকে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির সেরা জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কুরআন বলছে-

وَ لَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَ حَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ وَ رَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا ﴿٪۷۰﴾

আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিয্ক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি।
[সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৭০]।

কিন্তু এদের মানবিক চেতনার মধ্যে পাপ-পুণ্যের দুই বিপরীতমুখী উপাদানও রেখে দিয়েছেন। কুরআন বলছে-

فَمَنۡ یَّعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ خَیۡرًا یَّرَہٗ ؕ﴿۷﴾
وَ مَنۡ یَّعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ شَرًّا یَّرَہٗ ٪﴿۸﴾
অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালকাজ করলে তা সে দেখবে,
আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে।
[সূরা যিলযাল, আয়াত ৭-৮]

এর মানে মানুষ অপরাধে লিপ্ত হতে পারে ৷ এবং হয়ও ৷ ভালো মন্দ দুটি বিষয় আছে বলেই ভালোর গুরুত্ব উপলব্দি করা যায় ৷ মন্দের বিভীষিকা স্পষ্ট ৷ ইসলাম একটি উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন জীবন বিধান ৷ ইসলাম মৌলিক মানবীয় গুণাবলির বিকাশ সাধন ও মানবকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করে। উন্নত নৈতিক চেতনা ও আখেরাতের জবাবদিহি মানুষকে অপরাধ ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখে।

ইসলাম শান্তি ও সুবিচারের ধর্ম। প্রতারণা, ধোঁকাবাজি বা ঠকবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি ইসলামের কাঙ্খীত শান্তিকে ব্যাহত করে। এসব প্রতিরোধে ইসলামে শাস্তির বিধান ও আইন রয়েছে। শুধু আইন ও বিধান দিয়ে দুর্নীতি, অপরাধ দমন করা যায় না। যেহেতু আইন প্রয়োগে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া আছে। অন্যদিকে আইনকে বিভিন্নভাবে ফাঁকিও দেওয়া যায়। সেহেতু ইসলাম দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে, যা বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত এবং মানবীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল।

অপরাধ প্রবণতা থেকে বাঁচার জন্য ইসলামিক কিছু ফর্মূলা রয়েছে ৷ যা অনুসরণ করলে যাবতীয় অপরাধ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভবপর হবে ইনশাআল্লাহ ৷ আমরা তিনটি ফর্মূলা নিয়ে কথা বলবো ৷

এক. অন্তরের পরিশুদ্ধি।

মানুষের কর্মের উৎস তার অন্তঃকরণ বা কলব। স্বচ্ছ ও নির্মল অন্তর কোনো নীতি-নৈতিকতাবিরোধী কর্মে সমর্থন দেবে না। যে ব্যক্তির অন্তর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সে ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শত চেষ্টা করেও দুর্নীতি করতে পারবে না, পারে না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তরের অবস্থান সবচেয়ে শক্ত অবস্থান, তাই ইসলাম প্রথমে অন্তঃকরণ বা কলবকে দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতার বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মানবদেহে রয়েছে একটি মাংসপিণ্ড, সেটি সুস্থ থাকলে পুরো দেহ সুস্থ থাকে। আর সেটি বিনষ্ট হলে পুরো দেহ বিনষ্ট হয়। সেটি হলো কলব বা অন্তঃকরণ।’

এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন,
قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ زَکّٰىہَا ۪ۙ﴿۹﴾
وَ قَدۡ خَابَ مَنۡ دَسّٰىہَا ﴿ؕ۱۰﴾
‘সফলকাম হয়েছে সেই ব্যক্তি যে তার অন্তরকে শুদ্ধ করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে সে যে তা অকার্যকর করেছে।’ (আল কোরআন, সূরা আশ শামস ৯-১০)।

আল্লাহ আরও বলেন,
قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ تَزَکّٰی ﴿ۙ۱۴﴾
‘ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (আল-কোরআন, সূরা আলা ১৪)।

ইসলাম কলব বা অন্তঃকরণের পরিশুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা চায় যাতে তার মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার পরিচ্ছন্নতা ও পরিশুদ্ধতা অর্জিত হয়। অন্তরকে পূত পবিত্র করা গেলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে ৷ মনেই চাইবে না অবৈধ কাজে সায় দিতে ৷

দুই. আখেরাতে জবাবদিহির দায়িত্ববোধ সৃষ্টি।

ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়, তুমি দুর্নীতি করে অপরাধ করে আইনকে ফাঁকি দিয়ে শাস্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছ বলে মনে করো না, কারণ আল্লাহ যেদিন বিচারকের আসনে আসীন হবেন সেদিন তাঁর আদালতে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে। অপরাধ গোপন করার জন্য যত সব ব্যবস্থা দুনিয়ায় করে শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়েছিলে সেই কৌশল সেখানে কোনো কাজে আসবে না, যেহেতু সেদিন তোমার হাত-পা, অপরাধ করার স্থান সব সত্য সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তো প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, গোপনীয়-অগোপনীয় সবকিছু জানেন। তাঁর সামনে কোনো কৌশল চলবে না। আল্লাহর সামনে প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে অণুপরিমাণ সৎ কাজ করবে তা দেখবে, অন্যদিকে যে অণুপরিমাণ অসৎকর্ম করবে তাও দেখবে।’ (সূরা জিলজাল, আয়াত ৭-৮)। আল্লাহ সবকিছুর বিচার করবেন। তাঁর সামনে আমার অপরাধ, দুর্নীতি গোপন করার কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। অতএব, দুর্নীতি ও অপরাধের কারণে প্রাপ্য শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না- এ আকিদা, বিশ্বাস, মানসিকতা মানুষকে দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত করতে পারে। সেজন্য রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর সামনে হিসাব দেওয়ার সময়ের আগেই নিজের হিসাব নিজে কর।’ আল্লাহর সামনে সঠিকভাবে হিসাব দিতেই হবে এই মানসিকতা সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি পোষণ করলে সেই সমাজে দুর্নীতি ও অপরাধ হবে না।

তিন. সৎকাজে উৎসাহ প্রদান।

সুন্দর শান্তিময় জীবন গঠন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে নীতিসিদ্ধ ও সৎকর্ম সম্পাদনের কোনো বিকল্প নেই। সবাই যখন সৎকাজ করায় উদ্যোগী হবেন, অপরাধীরা নিজে থেকেই নিস্তেজ হয়ে যাবে এবং অপরাধ, দুর্নীতি করতে উৎসাহ পাবে না, এতে সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হবে। আল্লাহ মানুষকে সৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেন,

مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَ ہُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَ لَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۹۷﴾
যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।
(আল কোরআন, নাহল ৯৭)।

আল্লাহ আরো বলেন,
اِلَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ تَوَاصَوۡا بِالۡحَقِّ ۬ۙ وَ تَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ ٪﴿۳﴾
তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।
[সূরা আসর, আয়াত ৩]

এভাবে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস রয়েছে যা মানুষকে সৎকাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে, যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দুর্নীতি করার প্রতি মানুষের উৎসাহ কমে যায়। এভাবে সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

- Advertisement -