- Advertisement -

- Advertisement -

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে ইসলামপন্থীরা বিরোধী অবস্থানে কেন

মনির আহমেদ মনির

23

গত ১৫ এপ্রিল রাতে ফেস দ্যা পিপলের টকশোতে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর হেফাজতের একজন দায়িত্বশীল আলেমকে লক্ষ্য করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নটি সেকুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে। হেফাজত নেতার কাছে তিনি সবিনয়ে জানতে চেয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিরোধীভাব কেন?

সম্মানিত আলেম সময়ের স্বল্পতা হেতু খুব সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছেন এবং তার সাথে পরে সরাসরি কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন। তবে ভিপি নূর ও টকশোতে থাকা আরেক অতিথি আওয়ামী সাংসদ জনাব মুন্না এমপি ইসলাম সম্পর্কে কম জানার হেতু বা অন্য কোন কারণে সে সংক্ষিপ্ত উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হয়নি। এ প্রশ্নটি যেহেতু ভিপি নূরের একার নয়, অনেকের মাঝেই বিরাজ করে; তাই আগ্রহী পাঠকদের সুবিদার্থে আমরা প্রশ্নটির নাতিদীর্ঘ উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।

আলোচনার শুরুতেই ভিপি নূরের প্রশ্নটি দেখা যাক। নূর বলেন,
“ আমরা সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে তো এটাই বুঝি, তোমার ধর্ম তুমি পালন করবা, আমার ধর্ম আমি পালন করবো। আমি যতোটুকু সীমিত শিক্ষায় জানি, ইসলাম ধর্ম আমাকে এই শিক্ষা দেয় না জোর করে কাউকে ধর্মান্তরিত করো, অন্য ধর্মের মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করো- বরং ইসলামই তো মানুষকে প্রতিবেশী হক আদায় করার জন্য বলে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপনারা আসলে একটু বিরোধী অবস্থানে কেন? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলেন, অনেক মানুষের প্রশ্ন এটা, ইন্টেলেকচুয়াল, আপনার সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটির অনেকের প্রশ্ন। আপনি যদি বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করেন। আমি একটু সবিনয়ে জানতে চাই!“

এখানে ‘তোমার ধর্ম তুমি পালন করবা, আমার ধর্ম আমি পালন করবো’ কথাটি শুনতে খুব সুন্দর শোনালেও এবং ইসলামের সাথে একদিক থেকে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও বক্তার উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথা বাকি আলোচনা পন্ডশ্রমে পরিণত হতে পারে। ধর্ম বলতে বর্তমানে আমরা ব্যক্তির নিজেস্ব কিছু বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতা(ইবাদত, উপাসনা) বুঝে থাকি। আমাদের সমাজে ধর্মপালন বলতে বোঝায় ধর্মীয় পবিত্র স্থানে(মসজিদ,মন্দির,গির্জায়) গিয়ে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ, কিছু আচার, উৎসব ও প্রথাপালন। প্রচলিত ধর্মের এই সীমিত অর্থ নিলে বলতে হয় বিদ্যমান অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলাম নিছক কিছু প্রথা সর্বস্ব ধর্ম নয়, ইসলাম কিছু নির্দিষ্ট আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল জীবনব্যবস্থার নাম।

ইসলামে যেমন পরকালের কথা আছে, একান্ত আল্লাহর জন্য ইবাদতের কথা আছে, আবার ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রজীবনের ব্যাপারেও সত্য-সুন্দর, অলঙ্ঘনীয় দিকনির্দেশনা এবং বিধি-নিষেধ রয়েছে। আর ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন(ধর্ম,জীবনব্যবস্থা)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا) … [المائدة: 3]

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন(ধর্ম,জীবনব্যবস্থা) হিসাবে পছন্দ করলাম’ (সূরা আল-মায়েদা:৩)।

ইসলামী আকিদা অনুসারে ইসলামের বিপরীত যাবতীয় মতবাদ ও ধর্ম ভুল, পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
ہُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَہٗ بِالۡہُدٰی وَ دِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡہِرَہٗ عَلَی الدِّیۡنِ کُلِّہٖ ۙ وَ لَوۡ کَرِہَالۡمُشۡرِکُوۡنَ]﴿۳۳]

‘তিনিই সে সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যেন তিনি অন্য সকল দ্বীনের উপর একে বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সূরা তাওবাহ:৩৩)

অর্থাৎ ইসলামকে সকল ধর্ম, জীবনব্যবস্থা তথা দ্বীনের উপর বিজয় করা রাসূলদের ও তাদের অনুসারী তথা মুসলিমদের উপর আল্লাহ প্রদত্ত মহান দায়িত্ব ও মিশন। যৌক্তিকভাবেই ইসলাম সকল ধর্মকে সমান চোখে দেখে না, সত্য ও মিথ্যা সমানও হতে পারে না। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো সকল ধর্ম ও দ্বীনের উপর ইসলামকে বিজয়ী করার মিশন নিয়ে কাজ করা, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা তথা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। [ এ পর্যন্ত পড়ে থাকলে পুরো লেখা পড়ার অনুরোধ রইলো, অন্যথা ভুল বোঝার সম্ভবনা রয়েছে]

এবার আসা যাক সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। আমরা সকলেই জানি যেকোন মতবাদ সূচনা ও বিকাশ লাভের পেছনে প্রেক্ষাপট থাকে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একটি মতাদর্শকে ভুল প্রমাণ করতে আরেকটি মতবাদ জন্মলাভ করে। সেক্যুলারিজমের ক্ষেত্রেও বিষয়টির ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেক্যুলারিজমের মূল কথা হলো বর্তমান সময়ের জীবন সমস্যার সমাধানে ধর্ম অপারগ ও অচল। তাই কল্যাণ ও প্রগতির জন্য ধর্মের স্থানে অধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক্ষেত্রে সেক্যুলারিজমকে বোঝার জন্য এর উদ্ভবের ইতিহাস জানা থাকা জরুরী।

বর্তমান সেক্যুলারিজম মতবাদ হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে মধ্যযুগে ইউরোপে। খ্রিষ্টীয় পনেরো শতাব্দী থেকে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। তখনকার ইউরোপীয় সমাজে গীর্জা ও তার পাদ্রীদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। পাদ্রীরা নিজেদের কথাকে ধর্মের প্রলেপ লাগিয়ে প্রচার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতো। বিজ্ঞানীদের গবেষণামূলক মত পাদ্রীদের অসার উক্তি গুলোকে ক্রমাগত ভুল প্রমাণ করে। এরফলে বিজ্ঞানীদের সাথে পাদ্রীদের মতবিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। পাদ্রীগণ নিজেদের ইমেজ ধরে রাখার জন্য অনন্যপায় হয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মনগড়া ব্যাখ্যা রক্ষায় ধর্মের দোহায় দেয়া শুরু করে । অবস্থা বেগতিক দেখে একপর্যায়ে গির্জাগুলো সরাসরি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় , গির্জা কর্তৃক Inquisition কোর্ট গঠন করা হয় এবং বিজ্ঞানীদেরকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস (Copernicus) ১৫৪৩ সালে ‘‘আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের আবর্তন’’ নামক একটি বই প্রকাশ করেন। গির্জা কর্তৃক বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।

খ্যাতিমান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও (Galileo) টেলিস্কোপ আবিস্কার করার কারণে ৭০ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর ওপর কঠোর নির্যাতন নেমে আসে। ১৬৪২ সালে তিনি মারা যান।

বিজ্ঞানী স্পিনোজা (Spinoza) ছিলেন ইতিহাস সমালোচনার প্রবক্তা। তাঁর শেষ পরিণতি হয়েছিল তরবারীর আঘাতে মৃত্যুদণ্ড।

এভাবে বিজ্ঞানীদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন ও চরমদণ্ড। এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় যা হবার তাই হলো! চিন্তক ও গবেষকদের উপর নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় বিজ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের মধ্যে বিদ্রোহের সূচনা হয়। পাদ্রিদের নিজস্ব মনগড়া মতামতের ভ্রান্তি যতই প্রমাণিত হয় বিদ্রোহীদের শক্তি ও মনোবল ততই বৃদ্ধি পায়। ধর্মের নামে পাদ্রীদের এই অধার্মিক আচরণ বিদ্রোহীদের মনে প্রবল ধর্ম বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তারা ধর্মকে সকল অমঙ্গলের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বিদ্রোহীরা সিদ্ধান্ত নেয় সমাজজীবনের সকল স্তর থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করবে। ধর্মের কর্তৃত্ব ধ্বংস না করলে অগ্রগতি সম্ভব নয়। পাদ্রীরাও রাজশক্তি ও ধর্মান্ধ জনতাকে সাথে নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করা শুরু করে । বিদ্রোহীদের সাথে এ সংঘাত দুইশত বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে । যা রাষ্ট্র বনাম গির্জা সংঘাত নামে পরিচিত ।[1]

দীর্ঘ সংঘাতের একপর্যায়ে একদল সংস্কারবাদীর আবির্ভাব ঘটে। তারা উভয় পক্ষকে একটি সিদ্ধান্তে আনতে সক্ষম হন। তা হলো , “ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকুক এবং মানুষের ধর্মীয় কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ক্ষমতা চার্চের হাতে থাকুক। কিন্তু সমাজের পার্থিব জীবনের সকল দিকের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতে থাকবে এবং পার্থিব কোন বিষয়েই চার্চের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। অবশ্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে ক্ষমতা নেবার সময় চার্চের নিকট রাষ্ট্র পরিচালনার রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ গ্রহণ করতে হবে ।”

কোণঠাসা হয়ে যাওয়া পাদ্রীরা কেবল গির্জার কর্তৃত্ব পেয়েই আপোষ প্রস্তাব এক বাক্যে মেনে নেয়। আর বিদ্রোহীরাও রাষ্ট্র সমাজ ও অর্থনীতি থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করতে পেরে সানন্দে প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হয়।

মূল কথা দাঁড়ায় ব্যক্তি মসজিদে যাবে নাকি গির্জায় যাবে নাকি কোথাও যাবে না- এটা তার একান্ত ঐচ্ছিক ব্যাপার। রাষ্ট্র এখানে নাক গলাবে না, তবে রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্মের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকবে। সেক্যুলারিজমের প্রধান আদর্শিক প্রতিপক্ষ যেহেতু ধর্ম তাই সেক্যুলার রাষ্ট্রকে জনগণের একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিমণ্ডলেও ধর্ম পালনে ব্যাঘাত ঘটানোর প্রয়াস চালাতে দেখা যায়।

তবে আমরা একথা স্বীকার করি, এর সংজ্ঞা ও বাস্তব প্রয়োগের ব্যাপ্তি নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে। তবে সকল ধর্মনিরপেক্ষ তাত্ত্বিক একমত যে, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে এমন এক মতবাদ যেখানে রাষ্ট্র থাকবে ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতিতে ধর্মের প্রবেশাধিকার হবে নিষিদ্ধ। রাষ্ট্র নিজে কোন ধর্মচর্চা করবে না।

- Advertisement -

ক্যামব্রিজ ইংলিশ ডিকশনারিতে সেক্যুলারিজমের সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে ,
“secularism definition: the belief that religion should not be involved with the ordinary social and political activities of a country.”
“ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা: দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধর্ম জরিত হওয়া উচিত নয় এমন বিশ্বাস ।”[2]

ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘ইহজাগিতিকতার প্রশ্ন’ প্রবন্ধে বলেন ,

‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, এই কথাটা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পরই খুব জোরেসোরে বলা হচ্ছে। কথাটা সত্য বটে আবার মিথ্যাও বটে। সত্য এ দিক থেকে যে, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকদের এ পরামর্শ দেয় না যে, তোমাদের ধর্মহীন হতে হবে; কিন্তু তা বলে এমন কথাও বলে না যে, রাষ্ট্র নিজেই সকল ধর্মের চর্চা করবে, কিংবা নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্ম চর্চায় উৎসাহিত করবে। রাষ্ট্র বরঞ্চ বলবে ধর্মচর্চার ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিজের কোন আগ্রহ নেই, রাষ্ট্র নিজে একটি ধর্মহীন প্রতিষ্ঠান।ধর্ম বিশ্বাস নাগরিকদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। রাষ্ট্রের ওই ধর্মহীনতাকেই কিছুটা নম্রভাবে বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা।'[3]

এছাড়া আমেরিকান হেরিটেজ ডিকশনারীতে secularism শব্দটির সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে –
“The view that religious considerations should be excluded from civil affairs or public education.”

“নাগরিক বিষয় বা পাবলিক শিক্ষা থেকে ধর্মীয় বিবেচনা বাদ দেওয়া উচিত ” [4]

এসকল সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয়, ধর্মকে রাষ্ট্রের কাজের সাথে জড়ানো যাবে না- এটাই সেক্যুলারিজমের মূল কথা। ধর্ম যদিও থাকতে পারে, তবে তা থাকবে জনগণের একান্ত ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে – ‘প্রাইভেট’ ব্যাপার হিসেবে; ‘পাবলিক’ ব্যাপার স্যাপারে তাকে জড়ানো যাবে না।

এপর্যায়ে নুরুল হক নূর ভাই বা সমচিন্তার অন্যান্য ভাইরা বলতে পারেন, আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষতা তো এক হবে না, দুইয়ের মধ্যে বুঝ ও প্রয়োগের পার্থক্য আছে। এক্ষেত্রে নূর ভাইদের কাছে সবিনয় প্রশ্ন থাকবে সে পার্থক্য কতটুকু? সে ধর্মনিরপেক্ষতা অনুযায়ী কী রাষ্ট্র একক কোন ধর্ম বা আরো স্পেসিফিক বললে রাষ্ট্র শরিয়াহ আইন মেনে নিবে? কোরআন সুন্নাহ কী শাসনযন্ত্রের আইনের প্রধান উৎস হবে? অর্থনীতি, কূটনীতি, রাজনীতি কী ইসলাম অনুযায়ী পরিচালিত করতে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকবে? যদি না হয় তাহলে তো ইসলামের সাথে আপনাদের বঙ্গীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতার সাথেও বিরোধ থেকেই যায়। আর যদি হয়, তাহলে শরীয়াহ আইনে পরিচালিত রাষ্ট্রকে কী কেউ সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিবে? ইসলাম নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, এর সাথে মানবরচিত মতবাদগুলোর বিরোধ থাকবে খুব স্বাভাবিক। বলা যায় ইসলামী আইন প্রত্যাখ্যানকারী রাষ্ট্রকে মুসলিম সমর্থন করার তো প্রশ্নই আসে না।

এখন কারও মনে সংশয় তৈরি হতে পারে ইসলাম অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হলে দেশে অবস্থানরত বাকি ধর্মাবলম্বী মানুষের অবস্থান কী হবে? এক্ষেত্রে আমাদের জানা থাকা উচিত, ইসলাম নিজেই ন্যায় ও ইনসাফের ধর্ম, সত্যের ধর্ম। ইসলাম চায় সকল মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিক, ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি পাক। এজন্য ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা অনুযায়ী খলিফা প্রথমে সকল অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানায়, যারা ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে তারা মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তাদের অতীত ভুলের কারণে কোনই ভৎসনা বা বৈষম্য করা হয় না। বরং ক্ষেত্রে বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আর যারা ইসলামের দাওয়াত কবুল করে না, তাদেরকে জিযিয়া বা নিরাপত্তা করের বিনিময়ে ইসলামি খিলাফতে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়, ইনসাফভিত্তিক নিরপত্তা করের বিনিময়ে তারা পূর্ণনিরাপত্তার সাথে থাকতে পারেন, তাদের ব্যক্তিজীবনে ধর্মপালনেরও অধিকার নিশ্চিত করা হয়। তার বিচারের ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ ইনসাফ পাবেন, কোন মুসলিম অমুসলিম জিম্মির(নিরপত্তা প্রাপ্তর) উপর জুলুম করে পার পাবে না। এটাই ইসলামের কালজয়ী শাশ্বত আদর্শ।

যেসকল অমুসলিম ইসলামও গ্রহণ করবে না, আবার জিযিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের অনুগত থাকতেও অস্বীকৃতি জানাবে, সে সকল নৈরাজ্যবাদী রাষ্ট্রদ্রোহী অমুসলিমরা ইসলামী খিলাফতে বসবাসের অধিকার পাবেন না, তাদের উচ্ছেদ করা হবে। খেলাফতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সবসময় নির্দিষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।(খলিফা, সেনাবাহিনী প্রধান, বিচারপতি প্রভৃতি) অন্যধর্মালম্বীদের মাঝে কেবল সত্য ধর্ম প্রচারের অনুমতি থাকবে, কোন মিথ্যা ও ভুল ধর্ম প্রচারের ধৃষ্টতা প্রদর্শনের স্বীকৃতি দেয়া হবে না। রাষ্ট্রের আইন হবে কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াসের ভিত্তিতে। বিশেষ ধার্মিক জ্ঞানী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরামর্শসভা থাকবে। তাদের সাথে পরামর্শ করে খলিফা শাসনকার্য পরিচানলা করবেন। খলিফা ইসলামী আইনের অনুগত ও জনগনের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য থাকবেন, স্বেচ্ছাচারী হওয়ার বৈধতা নেই।

ইসলামি খেলাফত কোন ইউটোপিয়ান ধারণাও নয়, যার বাস্তব প্রয়োগের সুদীর্ঘ গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ইসলামি খেলাফত যে অমুসলিমদের নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দেয়, তা শুধু কাগজে কলমে নয়, ইতিহাস থেকেই প্রমাণিত। এখানে সংখ্যালঘুদের নিরপত্তার জন্য প্রাচ্য থেকে সেকুলারিজম আমদানির প্রয়োজন নেই। ইনসাফের সর্বোত্তম আদর্শ ইসলামেই বর্ণিত হয়েছে। প্রাচ্যের খ্রিষ্টীয় গির্জাতন্ত্রের মতো ইসলাম বিজ্ঞানচর্চার বিরোধী নয়, ইসলাম বরং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে উৎসাহিত করে, ফজিলত বর্ণনা করে। ইসলামের সাথে কখনো জাগতিক জ্ঞানচর্চার বিরোধ ঘটেনি, এজন্য ইসলামি খেলাফতের জ্ঞানীদের সম্মানিত স্থান ছিল, ইসলামে কোন কুসংস্কারের স্থান নেই, তাই শাসনব্যবস্থা থেকে ইসলামকে বাদ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, আল কোরআনই সর্ব যুগের, সকল মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। তাই রাষ্ট্র , সমাজ , অর্থনীতি থেকে ইসলাম ত্যাগ করা তথা সেকুলারিজম গ্রহণের প্রশ্নই আসে না।

ইসলামের দাবি শুধু ব্যক্তি জীবন নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্গানকে ইসলামের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এখানেই সেকুলারিজমের সাথে ইসলামের বড় বিরোধ, মুসলিমদের বিরোধ। নূর ভাই সহ এরকম প্রশ্ন করা অনেককেই গর্বের সাথে মুসলিম পরিচয় দিতে দেখা যায়, এটা অবশ্যই একটি ভালো গুন। তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে সত্য ধর্ম ইসলাম পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়া, সর্বক্ষেত্রে ইসলামী বিধান বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেয়া। ইসলাম যেহেতু নিছক কিছু প্রথাসর্বস্ব ধর্ম নয়, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ষব্যবস্থা তাই সেকুলারিজমের পক্ষ নেয়ার অর্থ হলো বহু ক্ষেত্রে ইসলামি আইনের বিপক্ষে দাঁড়ানো, শত শত আয়াতের বিপক্ষে দাড়ানো, যা অবশ্যই একজন মানুষের জন্য আল্লাহর অসন্তুটির কারণ হবে। ইমান ভঙ্গের কারণ হবে।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কালামে মাজিদে বলেছেন,

اَلَّذِیۡنَ اِنۡ مَّکَّنّٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَ اَمَرُوۡا بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ نَہَوۡا عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَ لِلّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ ﴿۴۱﴾

“আমি তাদেরকে পৃথিবীতে (রাজ)ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে। [ সূরা আল হাজ্জ- ৪১]

অর্থাৎ শাসকের উপর ফরজ হলো নামাজ কায়েম করা, এখানে শুধু নামাজ নিজে পড়া নয়, প্রতিটি মুসলিমকে পড়া নিশ্চিত করা। সকল ধনবান মুসলিমদের থেকে যাকাত আদায় করে যথাযথ খাতে প্রদান করা। ইসলাম যেটাকে অন্যায় মনে করে তা বন্ধ করে দেয়া, আর যা আদেশ করে তা বাস্তবায়ন করা। এই কাজগুলো যিনি করবেন তাকে নিশ্চয়ই সেকুলার শাসক আপনারাও বলবেন না।

উক্ত আলোচনায় আশা করি ইসলামপন্থীদের ধর্মনিরপেক্ষতার পশ্নে বিরোধিতার কারণ স্পষ্ট হয়েছে। আমার এখানে সেকুলারিজমকে প্রশ্ন করিনি, অসারতাও তুলি ধরার চেষ্টা করিনি, জীবনবিধান হিসেবে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরাও এখানে সম্ভব হয়নি। আমরা কেবল প্রশ্নটি এড্রেস করার চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ প্রশ্নকারী ভাইদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান থাকবে আপনারা বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, সাইয়েদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া জীবনী পড়ুন। কোরআন পড়ুন, বোঝার চেষ্টা করুন। ইসলামের সুমহান আদর্শে জীবন, সমাজ ও বিশ্ব সাজাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। মনে রাখুন দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আমাদের ফিরে যেতে হবে আল্লাহর কাছে, তাই আল্লাহর সন্তোষ অর্জনই হোক আমাদের পরম কামনা।

তথ্যসূত্র:
1.http://www.iun*edu/~hisdcl/h113_2001/churchstate.htm[* এর স্থলে . হবে]

2.https://dictionary.cambridge*org/amp/english/secularism]

3.ইহজাগতিকতার প্রশ্ন প্রবন্ধ,’স্বতন্ত্র ভাবনা’ (চারিদক, 2008)

4.https://www.ahdictionary*com/word/search.html?q=secularist&submit.x=0&submit.y=0]

মনির আহমেদ মনির