চরমোনাই পীরের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা | তৃতীয় শক্তি হতে যাচ্ছে? | শীর্ষবার্তা ডটকম

0 1,702

সাদমান সাইফ, ঢাকা ৷

বর্তমান সময়ে আলোচিত দলের নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৷ পীর জগতের নামকড়া গোষ্ঠী হচ্ছে চরমোনাইর পীর সাহেবরা ৷ তাদেরকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই হক্কানী পীর বলে মনে করে থাকেন ৷ কেউ কেউ সমালোচনা করলেও তারা আধ্মাতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমানতালে এগিয়ে চলেছেন ৷ সুন্নাহ ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে সংগঠন পরিচালনা করায় দুর্দমনীয় গতিতে এগিয়ে চলছে এ দলটি ৷ ১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ দলটির জন্ম হয় ৷ ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলটির নাম ছিলো ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ ৷ কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের জন্য শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি দিতে হয় । নাম হয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৷ যদিও এদেশে যারাই ইসলামী রাজনীতি করছে সবারই দাবি তারা ইসলামী আন্দোলন করছে ৷ যাকে কুরআনে বর্ণিত জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ তারা বলে থাকেন ৷

দল গঠনের পর আমৃত্যু আমীর ছিলেন সৈয়দ ফজলুল করীম ৷ তার মৃত্যুর পর পারিবারিকভাবে পীর নির্বাচিত হন ফজলুল করিমের ছেলে মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। তিনি দলের রাজনৈতিক ও আধ্মাতিক রাহবার ৷ চরমোনাই পীর হিসেবে তিনিই বর্তমানে পরিচিত। দলেরও প্রধান তিনিই। চরমোনাই তরিকার মূল কেন্দ্রবিন্দু বরিশালের চরমোনাইতে ৷ তবে সারা দেশেই তাদের দলটির কার্যক্রম বিদ্যমান । দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলাতেই আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শক্তিশালী কমিটি। ধর্মভিত্তিক সমমনা অন্যান্য দলের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে তাদের অবস্থান লক্ষণীয় । এ কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দিন দিন তাদের উন্নতি চোখে পড়ার মতো । দেশের কয়েকটি ইউনিয়নে তাদের দলীয় চেয়ারম্যান এবং আছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরও।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তেমন চমক দেখাতে না পারলেও দলটির উন্নতি বেশ ভালো করছে ৷ ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রত্যেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই অংশ নিয়েছে দলটি এবং ক্রমাগত ভোটের রাজনীতিতে উন্নতি করেছে। সূত্রমতে, চরমোনাইর পীরের দলটি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে নির্বাচন করে ৷ ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় এককভাবে। ওই নির্বাচনে ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এরপর ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করে ২৩টি আসনে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৯টি ভোট পায়।

গেলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৯৭টিতেই প্রার্থী দিয়েছিল দলটি ৷ হাতপাখা প্রতীক নিয়ে সর্বাধিক আসনে ভোটযুদ্ধে নেমে তাদের মনোনীত প্রার্থীরা ভোট পেয়েছেন ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০টি । তবে একজন বাদে বাকি সবাই জামানত হারিয়েছিলেন ।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভোটের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মোট ভোটের ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে হাত পাখা। সুতরাং ভোটের হিসেবে তাদের অবস্থান চতুর্থ। তবে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সবার ওপরে। তবে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়নি তা বাচ্চারাও জানে ৷ অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত ভোটারের ম্যাপ করা দুরূহ ৷

এ প্রসঙ্গে দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘এই নির্বাচন স্বাভাবিক হয়নি। যা আমরা ১ জানুয়ারি তুলে ধরেছি। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হতো, তাহলে আমরা এক কোটির বেশি ভোট পেতাম।’

চরমোনাই পীর সাহেব রেজাউল করিম বলেন, ইসলাম অর্থ শান্তি এবং এ ম্যাসেজটা শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট না। ইতিহাস সাক্ষ্য, বিজাতীয়রাও ইসলামের এ নীতি-আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়াতে শান্তি পেয়েছে। অন্যান্য ইসলামী দলগুলো ১৪ দল বা ২০ দলের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাই ইসলামী নীতি-আদর্শটা প্রচার করার সুযোগ তাদের নেই। এক্ষেত্রে আমরা স্বাধীনভাবে ভোটারদেরকে শান্তির দিকে ডাকতে পারবো। 
তিনি আরো বলেন, ৪০টির মতো নিবন্ধিত দলের মধ্যে ইতোমধ্যে সংবাপদপত্র ও বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বর্তমানে বাংলাদেশে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি। 

আমাদের দেশের রাজনীতিতে বড় দলদুটোর কাছে ‘ইসলামী ভোটব্যাংক’ আলাদা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। হিসেব কষে দেখা গেছে ইসলামী দলের সাপোর্ট যেদিকে যাচ্ছে তারাই ক্ষমতার মসনদে বসছে ৷ সুতরাং এই কারণে ইসলামী দলগুলোরও এক ধরনের প্রভাব লক্ষণীয়। বিগত সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে। তারা আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে পেছনে ফেলে উঠে এসেছে তৃতীয় অবস্থানে। এতে তাদের দলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হচ্ছে ৷ এমনকি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তাদের অবস্থান তৃতীয়। ভোটের রাজনীতিতে তাদের এই উত্থান এবং সাফল্য দৃষ্টি কেড়েছে সর্বমহলের।

দলটির প্রার্থী মাওলানা নাসির উদ্দিন হাতপাখা প্রতীক নিয়ে লড়েছেন ৷ তিনি পেয়েছেন ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট। নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি বলে দলটির অভিযোগ। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের ভোট ৫০ হাজার ছাড়াত বলে দাবি দলটির।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটিতে নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৷ তারা সেখানে তরুণ প্রার্থী সিলেক্ট করেন ৷ ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠ আসা শেখ ফজলে বারী মাসউদ ১৮ হাজার ৫০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন ৷ ভোটের হিসেবে তিনি তরুণ নেতা বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী, বাম জোটের জুনায়েদ সাকীর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভোট পান । আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৪ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন ইসলামী আন্দোলনের নেতা আবদুর রহমান। এরপর নারায়ণগঞ্জেও তারা চমক দেখান ৷ সেখানে তৃতীয় স্থান লাভ করেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মাছুম বিল্লাহ। তিনি পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৯১৪ ভোট। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির মনোনীত প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা পান ২৩ হাজার ৭১৮ ভোট। সেখানে বিএনপির মতো বড় একটি দলের প্রার্থীর ভোট ছিল ৩৪ হাজারের একটু বেশি। খুলনা সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুজাম্মিল হকের ভোট ছিল প্রায় ১৫ হাজার। যেখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর ভোট মাত্র দেড় হাজার। এইসব ক্যালকুলেশন ভোটের রাজনীতিতে চরমোনাইকে তৃতীয় শক্তিতে নিয়ে গেছে বলে দাবি দলটির ৷

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিই হলো প্রধান শক্তিশালী দুই দল ৷ এর বাইরে জাতীয় পার্টিরকে তৃতীয় শক্তি আগে বলা হলেও এখন তাদের ঘর ভাঙার ষোলকলা পূর্ণতার দিকে ৷ সাংগঠনিক মজবুতী ও ভোটব্যাংকে সাধারণত জামায়াতে ইসলামীকে শক্তিশালী দল হিসেবে গণ্য করা হতো। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পড়ে হুমকির মুখে ৷ সর্বশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি হয়ে প্রায় অস্তিত্ব বিলীনের পথে দলটির ৷ প্রথম সারির নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার পর তারা কার্যত ঘরমুখো হয়ে গেছে ৷ তাদের কার্যক্রম এখন পুরোটাই বাসাবাড়িমুখী ৷ প্রকাশ্য রাজনীতিতে তাদের দেখা যায় না বললেই চলে ৷ মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে ঝটিকা মিছিল করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয় মাত্র ৷ এখন নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনই নেই তাদের । দলীয় পরিচয়ে তাদের আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। জামায়াতে ইসলামীর সেই অবস্থানে অনেকটা চলে এসেছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। যদিও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে চরমোনাইর এই রাজনৈতিক দলটির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রচণ্ড জামায়াতবিরোধী মনোভাব রয়েছে তাদের মধ্যে। তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে তা প্রমাণিত হয় ৷ জামায়াতের কঠোর সমালোচক তারা ৷ তাছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী কোনো অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে নেই।


জামায়াতে ইসলামী বাদে ধর্মভিত্তিক কোনো দলের এককভাবে ভোটের রাজনীতিতে এই উত্থান আসলেই চোখে পড়ার মতো। তারা এভাবে এগিয়ে যাওয়ার রহস্য খুঁজে দেখা গেছে, তারা কোনো জোটে নেই। নব্বইয়ের দশকে শায়খুল হাদিস-আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের বড় অংশ ছিলো দলটির ৷ কিন্তু বিএনপির সঙ্গে যখন তারা জোট করে তখন ইসলামী আন্দোলন সরে যায়। দলটি নারী নেতৃত্বকে হারাম মনে করে এবং এ ব্যাপারে শুরু থেকেই হট লাইনে । ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটে ঢোকে দলটি ৷ কিন্তু নির্বাচনে বাজিমাত দেখাতে পারেনি দলটি। এরপর আর কোনো জোটে যায়নি চরমোনাই পীরের দল। একলা চলো নীতিতে তারা অটল অবিচল ৷

অনেক সমালোচক মনে করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের একটা সখ্য আছে ৷ এ কথাটি মার্কেটে বেশ চাউর ৷ যদিও এর সপক্ষে তথ্যগত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ যেভাবে অন্যান্য দলের ওপর কঠোর মনোভাব ৷ তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রাখছে ৷ সে হিসেবে অন্যান্য চরমোনাইকে একটু বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয় বলে অভিযোগ আছে। তবে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দলটি।

জামায়াতে ইসলামীর বাইরে দেশে আরও অনেকগুলো ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে। প্রায় ডজনখানেক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা। প্রতিটি দলই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ৷ তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম তাদের পরিচালিত মাদরাসাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ৷ জনসাধারণের সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে ৷ এসব দলগুলো অন্যান্য বড় দলের সঙ্গে জোটে জড়িয়ে এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে পড়ে কয়েক টুকরো ৷ একমাত্র ব্যতিক্রম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ দলটিতে এখনো বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি ৷ অন্যান্য দল যেখানে নেতৃত্ব ও আভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজমান সেখানে চরমোনাই নীরবে কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছে ৷ এজন্যই দিন দিন ভালো করছে দলটি। এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আগামী দিনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এদেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র নিজস্বঅবস্থান গড়ে তুলতে পারবে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

- Advertisement -