ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি মাওলানা শরিফ আহমাদ

192

ফরজ গোসলের নিয়ম ও পদ্ধতি

 

 

সুপ্রিয় পাঠক‌ । আজ আপনাদের ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম  ও পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করবো‌ ইনশাআল্লাহ ।‌‌ অতএব পাঁচ মিনিট আমার সঙ্গে থাকুন । পুরো লেখাটি পড়ুন । উপকৃত হবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস । সুতরাং এবার শুরু করা যাক ।

 

 

গোসল কি ও কেন ?

 

আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে গোসল কি ও কেন ? কেনই বা গোসল করতে হবে ? প্রথম প্রশ্নটির উত্তর এভাবে দিতে চাই । আপনাদের বুঝতে সহজ হবে ইনশাআল্লাহ । গোসলের আভিধানিক অর্থ হল পানি দ্বারা ধৌত করা।‌ আর শরীয়তের পরিভাষায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর ধৌত করাকে গোসল বলে । দ্বিতীয় প্রশ্ন অর্থাৎ গোসল কেন করতে হবে? কোরআন থেকেই জবাব শুনুন ।‌

وَ إِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوْا

 

অনুবাদ: যদি তোমরা নাপাক হয়ে থাক, তবে গোসল কর । ( সূরা মায়েদাহ – ৬)

কলামটি পড়তে পড়তে আপনাদের কারো মনে যদি এই প্রশ্ন জাগে গোসল করা জরুরি কেন ?

তাহলে আপনাদের পাল্টা প্রশ্ন করব ! আপনারা কি আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চান ? যদি হ্যাঁ বলেন তাহলে এবার ভালবাসা পাওয়ার ফর্মুলা শুনুন ।

 

اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ التَّوَّابِیۡنَ وَیُحِبُّ الۡمُتَطَہِّرِیۡنَ .

 

অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে ভালবাসেন । ( আল বাকারা – ২২২)

শারীরিক পবিত্রতা অর্জনের তিনটি পদ্ধতি । ১. অজু ২.গোসল ৩. তায়াম্মুম । আর এ সম্পর্কে ‌আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا قُمۡتُمۡ اِلَی الصَّلٰوۃِ فَاغۡسِلُوۡا وُجُوۡہَکُمۡ وَاَیۡدِیَکُمۡ اِلَی الۡمَرَافِقِ وَامۡسَحُوۡا بِرُءُوۡسِکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ اِلَی الۡکَعۡبَیۡنِ ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ جُنُبًا فَاطَّہَّرُوۡا ؕ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤی اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ اَوۡ جَآءَ اَحَدٌ مِّنۡکُمۡ مِّنَ الۡغَآئِطِ اَوۡ لٰمَسۡتُمُ النِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُوۡا مَآءً فَتَیَمَّمُوۡا صَعِیۡدًا طَیِّبًا فَامۡسَحُوۡا بِوُجُوۡہِکُمۡ وَاَیۡدِیۡکُمۡ مِّنۡہُ ؕ مَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ حَرَجٍ وَّلٰکِنۡ یُّرِیۡدُ لِیُطَہِّرَکُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ .

অনুবাদ: হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর। (আল মায়িদাহ – ৬)

প্রিয় পাঠক । গোসল আসলেই এমন একটি জরুরী বিষয় যার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি দেহ-মনে বিশেষ প্রশান্তি লাভ হয় । শরীরের ক্লান্তি দূর হয়ে মন প্রফুল্ল থাকে । শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করতে সহায়ক হয় । সর্বোপরি পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত জীবন গঠন ও ইবাদত বন্দেগিতে মনোযোগ বৃদ্ধি পায় । তাই গোসলের কোন বিকল্প নেই ।

এবার গোসলের প্রকারভেদ সম্পর্কে জানুন । গোসল মোট চার প্রকার:

১. ফরজ গোসল

২.ওয়াজিব গোসল

৩. সুন্নাত গোসল

৪. মুস্তাহাব গোসল ।

 

- Advertisement -

আচ্ছা গোসল ফরজ বা ওয়াজিব হয় কি কারণে ? এটা আগে জানালে ভালো হয় না ? হ্যাঁ এটাই এবার শুনুন । ধারাবাহিক ভাবে উল্লেখ করছি। পাঁচটি কারণে গোসল ফরয হয়:

১. স্বামী স্ত্রীর মিলন করলে কিংবা অন্য কোনো কারণে জোশের সাথে বীর্যপাত ঘটলে ।

২. স্বামী লিঙ্গের শুধু অগ্রভাগ ( খতনা করা স্থান) স্ত্রীর গোপনাঙ্গে প্রবেশ করলে । (এক্ষেত্রে বীর্য বের না হলে গোসল ফরজ হবে )

৩. ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে । (তবে কাপড় বা শরীরে বীর্যের কোন চিহ্ন পাওয়া না গেলে গোসল ফরজ হয় না । চাই স্বপ্নে যাই দেখুক না কেন )

৪. মহিলাদের হায়েজ শেষ হলে ।

৫. মহিলাদের নেফাসের রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে । 

 

গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারন

 

১. কোন মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে জীবিতদের উপর তাকে গোসল দেওয়া ওয়াজিব ।

২. মৃত্যু ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পর গোসল দাতার গোসল করা ওয়াজিব । (তবে কেউ কেউ এটাকে সুন্নাত বলেছেন)

৩. যদি কোন ছেলে মেয়ে ১৫ বছরের পূর্বে বালেগ হয় ( অর্থাৎ স্বপ্নদোষ কিংবা যেকোন উপায়ে বীর্যপাত ঘটে) তাহলে তার উপর গোসল ওয়াজিব ।

( জামিউস সুনান, পৃষ্ঠা নং ৩০ )

গোসল ফরজ এবং ওয়াজিব হওয়ার কারণ তো জানা হলো । এবার জানুন সুন্নাত এবং মুস্তাহাব গোসলের অবস্থা । চার অবস্থায় গোসল করা সুন্নাত:

১. জুমার দিন জুমার নামাজের জন্য গোসল করা সুন্নাত ।

২. ঈদের দিন ঈদের নামাযের জন্য গোসল করা সুন্নাত

৩. হজ ও ওমরার ইহরাম বাধার জন্য গোসল করা সুন্নাত ।

৪. হাজীদের জন্য আরাফার ময়দানে অবস্থানের সময় যাওয়ালের পর গোসল করা সুন্নাত। ( হেদায়া, পৃষ্ঠা নং ১১৮ )

 

আর ১২টি অবস্থায় গোসল করা মুস্তাহাব:

 

১. ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অমুসলিমদের গোসল করা মুস্তাহাব ।

২. কোন ছেলে অথবা মেয়ে যদি ১৫ বছরে উপনীত হয় এবং তাদের মাঝে যৌবনের কোন নিদর্শন প্রকাশ পেলে তাদের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব ।

৩. পাগলামি, মাতলামি ও অচেতনতা দূর হওয়ার পর গোসল করা মুস্তাহাব ।

৪. মদীনা শরীফে প্রবেশের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব ।

৫. মুজদালিফায় অবস্থানের সময় ফরজ নামাজের পর গোসল করা মুস্তাহাব ।

৬. তাওয়াফে জিয়ারতের সময় গোসল করা মুস্তাহাব।

৭. শয়তানকে কংকর নিক্ষেপের সময় গোসল করা মুস্তাহাব ।

৮. চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ নামাজের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব ।

৯. ভয় ও মুসিবতের নামাজের সময় গোসল করা মুস্তাহাব।

১০. কোন গুনাহ থেকে তাওবা করার জন্য গোসল করা মুস্তাহাব ।

১১. সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করার সময় গোসল করা মুস্তাহাব ।

১২.ইস্তিহাযা মহিলার জন্য ইস্তিহাযার শেষ হওয়ার পর গোসল করা মুস্তাহাব ।

( জামীউস্ সুনান, পৃষ্ঠা নং ৩০, শরহে বেকায়া, পৃষ্ঠা নং ৭৭, নুরুল ইযা, পৃষ্ঠা নং ৩৯)

প্রিয় পাঠক । গোসলের ফরজ, ওয়াজিব ,সুন্নাত ও নফলের কথা পড়তে পড়তে হয়তো ক্লান্তি বোধ করেছেন ।‌ জানার জন্য একটু কষ্ট তো করতে হবেই ।

এবার আপনাদের জানাবো উলঙ্গ হয়ে গোসল করার কথা ।‌ আর এ জন্য একটা শিরোনাম দিয়ে দিই । তাহলে পাঠ শেষে মূল পয়েন্টগুলো নোট করতে আপনাদের সহজ হবে ।

 

উলঙ্গ হয়ে গোসল করা যাবে কি?

 

বাথরুমে উলঙ্গ হয়ে গোসল করা জায়েয । তবে প্রয়োজন ছাড়া উলঙ্গ হয়ে গোসল করাটা অনুচিত।‌ হাদীসে এ ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। সুতরাং তা পরিহার করা জরুরী । এক্ষেত্রে হাদীসটি স্মরণ রাখার মত ।‌

 

হযরত মুয়াবিয়া বিন হাইদা হতে বর্ণিত। একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, তুমি তোমার বিবি ও তোমার দাসী ছাড়া অপরের নিকট হতে তোমার লজ্জাস্থানকে সর্বদা রক্ষা কর (অর্থাৎ ঢেকে রাখবে)। আমি বললাম-ইয়া রাসূলাল্লাহ! বলুন! যদি কোন ব্যক্তি নির্জনে একাকী থাকে! (তখনও কি তা ঢেকে রাখতে হবে? প্রয়োজন ছাড়া খোলা নিষিদ্ধ?) তিনি বললেন (হ্যাঁ) আল্লাহ তাআলাকে অধিক লজ্জা করা উচিত। [জামে তিরমিজী, হাদীস নং-২৭৬৯]

 

আপনারা পড়ছেন – ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম

 

প্রিয় পাঠক । হয়তো কারো মনে এই প্রশ্নটি জীবনে অনেক বার এসেছে । কিন্তু লজ্জায় কাউকে বলতে পারেননি । আর সেটি হচ্ছে হস্তমৈথুনের পর গোসল করার বিধান কি ?

লজ্জা নয় আজ আপনাদেরকে বিষয়টা জানাতেই হবে । আপনাদের জানতেই হবে ।

আপনারা বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত যাই হোন না কেন ! উত্তেজনার সাথে বীর্যপাত হলেই গোসল করা আবশ্যক। তাই হস্তমৈথুন দ্বারা উত্তেজনের সাথে বীর্যপাত হলে অবশ্যই গোসল করে নামায পড়তে হবে। শুধু অজু করার দ্বারা পবিত্রতা অর্জিত হবে না। দলীল দেখুন ।

إِنَّمَا الْمَاءُ مِنَ الْمَاءِ

অনুবাদ: পানি (নির্গত হবার দ্বারা) পানি (শরীরে ঢালা তথা গোসল) আবশ্যক হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩৪৩)

আর কথাটা ভাল করে মনে রাখবেন হস্তমৈথুন করা জায়েজ নয়।

 

হস্তমৈথুন করার পর ফরজ গসলের নিয়ম

হস্তমৈথুনকারীর উপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত।

( মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-৪/৩৭৯, আব্দুর রাজ্জাক-৭/৩৯১, হাদীস নং-১৩৫৯, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৪৪০৫৭)

হস্তমৈথুন জীবনকে ধ্বংস দেয় । দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও কলহ হওয়ার ক্ষেত্রে এটা প্রধান কারণ । মারাত্মক এই অন্যায় কেউ করে থাকলে তাওবা করে নিবেন । আগামীতে এই কাজ না করার পাক্কা নিয়োগ করবেন । এবং আল্লাহর কাছে দুআ করবেন এটা থেকে বাঁচার জন্য । ( আর যদি বিস্তারিতভাবে জানতে ইচ্ছা হয় তাহলে কমেন্ট বক্সে জানান । আলাদা একটা কনটেন্ট লিখে দিব ইনশাআল্লাহ )

 

এবার আপনাদের গোসলের ফরজ তিনটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে গোসলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম উল্লেখ করছি ।

 

গোসলের ফরজ ৩ টি :

 

১. ভালভাবে কুলি করা। তিনবার গড়গড়া করা সুন্নাত ।

 

২. নাকের নরম স্থান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো । নাকের মধ্যে শুকনো ময়লা থাকলে তা দূর করে তিনবার পানি পৌঁছানো সুন্নত ।

 

৩. সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছে দেওয়া ।

 

ফরজ গোসলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম

 

* গোসলখানা নোংরা থাকলে কিংবা গোসলখানার মধ্যে পায়খানা থাকলে বাম পা দিয়ে প্রবেশ করবেন । আর তার মধ্যে পায়খানা না থাকলে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে যেকোনো পা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন ।

* গোসলের জন্য কাপড় খোলার সময় এই দোয়াটি পাঠ করতে পারেন ।

بسم الله الذي لا اله الا هو .

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ হিল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়া ।

* তবে গোসলখানা নোংরা থাকলে বা গোসলখানা এডজাস্ট পায়খানা থাকলে এ দুআটি বাইরে থেকে কাপড় খোলার সময় পড়বেন ।

* গোসলের নিয়ত করা সুন্নাত আর গোসলের নিয়ত এভাবে করা যায়-

نويت الغسل من الجنابة.

ফরজ গোসলের নিয়ত

উচ্চারণঃ নাওয়াইতুল গুসলা মিনাল জানাবাতি ।

- Advertisement -

অর্থ: আমি জানাবাত থেকে পবিত্রতা হাসিল করার জন্য গোসলের নিয়ত করছি ।

* বসে গোসল করা উত্তম ।

* আড়ালে স্থানে এবং সতর ঢেকে গোসল করা মুস্তাহাব । আড়াল স্থান হলে উলঙ্গ হয়ে গোসল করা জায়েয । তবে মুস্তাহাবের খেলাফ ।

* কেবলা মুখী হয়ে গোসল না করা উত্তম ।

* গোসলের শুরুতে উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত ধৌত করবেন । এটা সুন্নাত । তারপর পেশাব পায়খানার রাস্তা তাতে নাপাকি না থাকলেও ধৌত করা সুন্নাত । তারপর শরীরের কোন স্থানে নাপাকি থাকলে তা ধৌত করা সুন্নাত । তারপর নামাজের অযুর মতো অযু করবেন ।‌‌

 

গোসলের পূর্ণাঙ্গ সুন্নাত পদ্ধতি

 

১. শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়া ।

( মুসনাদে আহমদ )

২. গোসলের পূর্বে পেশাব-পায়খানার কাজ সেরে নেওয়া ।‌ ( মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং ১০২০)

৩. পৃথকভাবে উভয় হাত কব্জি ধৌত করা ।

( বুখারী ও মুসলিম , বুখারী- ২৪৬)

৪. পবিত্রতার নিয়ত করা । হে আল্লাহ আমি নাজাসাত থেকে পবিত্রতা হাসিলের উদ্দেশ্যে গোসল করছি ।

৫. শরীর বা কাপড়ের কোন স্থানে নাপাকি লেগে থাকলে প্রথমে তারা তিনবার ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া ।

( সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২১)

৬. নাপাকি লেগে থাকলে বা না লেগে থাকলে সর্ব অবস্থায় যৌনাঙ্গ ধৌত করা। এরপর উভয় হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া ।‌ ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৯)

৭. প্রথমে মাথায় পানি ঢালা । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৬)

৮. এরপর ডান কাঁধে পানি ঢালা। ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৪)

৯. এরপর বাম কাধে পানি ঢালা । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৪)

১০. অতঃপর অবশিষ্ট শরীর ভেজানো । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৪)

১১. বসে গোসল করা উত্তম । ( আহসানুল ফাতাওয়া প্রথম খন্ড )

১২. আড়ালে গোসল করা ।

১৩. সতর থেকে গোসল করা ।

১৪.কেবলামুখী হয়ে গোসল না করা ।

১৫. গোসলের পূর্বে নামাজের মত সুন্নাত তরীকা অজু করা । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬০)

১৬. মেসওয়াক করা ।

১৭. সমস্ত শরীরে তিনবার পানি ঢালা ।

১৮. সমস্ত শরীর হাত ধরা ঘষেমেজে ধৌত করা ।

১৯. গোসলখানায় পানি জমে থাকলে গোসলের পর অন্যত্রে পা ধৌত করা ।

২০. সমস্ত শরীরে এমন ভাবে তিনবার পানি পৌঁছানো যেন একটি পশমের গোড়াও শুকনো না থাকে । তবে নদী পুকুর ইত্যাদিতে গোসল করে কিছুক্ষণ ডুব দিয়ে থাকলে তিনবার পানি ঢালার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে ।

( সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪৯ মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদিস নং ৮১৩)

 

 

নারীদের ফরজ গোসলের নিয়ম

 

নারী-পুরুষের ফরজ গোসলের নিয়ম প্রায় একই রকম হালকা কিছু পার্থক্য আছে ‌ । লক্ষ্য করুন ।

গোসলের ফরজ ৩ টি :

১. ভালভাবে কুলি করা। তিনবার গড়গড়া করা সুন্নাত ।২. নাকের নরম স্থান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো । নাকের মধ্যে শুকনো ময়লা থাকলে তা দূর করে তিনবার পানি পৌঁছানো সুন্নত ।

৩. সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছে দেওয়া । মহিলাদের হাতে নাকে কিংবা কানে অলংকার না থাকলে তার ছিদ্রে পানি পৌঁছাতে হবে । অলংকার থাকলে নাড়াচাড়া ছিদ্রের স্থানে পানি পৌছাতে হবে । চুলের বেনি ও খোপা না খুলে যদি সব চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো সম্ভব হয় তাহলে বেনি ও খোপা খোলা জরুরি নয় । তা সম্ভব না হলে বেনি ও খোপা খুলে নিতে হবে ।

মোটাসোটা মহিলাদের বিভিন্ন অঙ্গের চিপায়-চাপায় ভালো হবে পানি পৌঁছাতে হবে ।‌

গোসলের স্থানে পানি জমা হয়- এমন স্থানে গোসল করলে গোসলের পরে অন্যত্র সরে গিয়ে পা ধোয়া সুন্নাত ।

সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানোর সুন্নাত তরীকা হল প্রথমে ভেজা হাত দ্বারা সমস্ত শরীর ভিজিয়ে নিবে । তারপর তিনবার মাথায় পানি ঢালবে । তারপর তিনবার ডান কাঁধে পানি ঢালবে । তারপর তিনবার বাম কাঁধে পানি ঢালবে । প্রতিবার পানি ঢেলে ভালো করে শরীর মর্দন করে পরিষ্কার করা সুন্নাত ।

গোসলের পর পানি মুছে ফেলার জন্য গামছা- তোয়ালে কিছু থাকলে তা দিয়ে শরীর মুছে ফেলবে । তারপর যত সম্ভব দ্রুত কাপড় দ্বারা শরীর আবৃত করে নেবে।

গোসলখানা থেকে বের হওয়ার সময় ডান পা দিয়ে বের হবে । ঐ সময় অযুর শেষে যে সব দোয়া পড়া মুস্তাহাব সেগুলো পড়া যাবে । গোসলের পর কোন অঙ্গ ধোয়া হয়নি বা কোথাও শুকনো রয়ে গেছে মনে হলে শুধু সেটা ধুয়ে নিলেই চলবে । পুরো গোসল পুনরায় করার প্রয়োজন নেই ।

 

প্রিয় পাঠক । রোজা রেখে ফরজ গোসল করবেন কিভাবে ? এ প্রশ্ন আপনাদের মনে না থাকলেও আমি জানিয়ে দিচ্ছি । কারণ সামনে রমজান মাস আসছে ।

 

রোজা অবস্থায় ফরজ গোসলের নিয়ম

 

প্রথমে নিয়ত করে নিবেন । আর নিয়ত টা এভাবে করতে পারেন – আমি নাপাকি দূর করার জন্য গোসল করছি । তারপর প্রথমে লজ্জাস্থানে লেগে থাকা নাপাকি ধুয়ে ফেলবেন ।‌ তারপর সাবান বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিবেন ।

 

তারপর নামাজের অজুর ন্যায় পূর্ণাঙ্গ অযু করবেন। এরপর পানি দিয়ে মাথা ভিজিয়ে নিবেন ।‌‌ তারপর প্রথমে শরীরের ডান অংশ এবং পরে পানি ঢালবেন। তারপর সারা শরীরে পানি ঢালবেন । (আবু দাউদ ২৪৫)

 

 

তবে রোযা অবস্থায় যেহেতু গরগরা করে কুলি করলে পানি ভেতরে প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকে । তাই গরগরা কুলি করবেন না । হালকা ভাবে করবেন ।‌ অনুরূপভাবে নাকের গভীরে পানি প্রবেশের চেষ্টা করবেন না । বরং হালকাভাবে নাকের মধ্যে পানি দিবেন । যাতে পানি একেবারে ভেতরে প্রবেশ না করে ‌। (তাহতাবী ১০২)

 

 

যেহেতু গোসলের দ্বারা অযুর ফরজ চারটি ভালভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়। তাই গোসল করার পর আলাদাভাবে অজু করার প্রয়োজন নেই। গোসল করার দ্বারাই অজু হয়ে যায়। তাই গোসল সম্পন্ন করার পর নতুন করে অজু না করে নামায পড়লে শুদ্ধ হয়ে যাবে। কোন সমস্যা নেই।

 

সহবাসের পর নিষিদ্ধ কাজ

 

প্রিয় পাঠক ।‌ গোসল ফরজ অবস্থায় অন্যান্য কাজগুলো করা বৈধ হলেও‌ এই পাঁচটি কাজ করা নিষেধ ‌।‌ পড়ুন ।‌ বুঝুন এবং স্মরণ রাখুন ‌।

 

১. নামাজ আদায় করা ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদাররা ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাত আদায় করো না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা বুঝতে পার যে, তোমরা নামাযে কী বলছ । তাছাড়া বড় নাপাকি হয়ে গেলে গোসল না করে সালাত আদায় করো না। (সূরা নিসা: ৪৩)

 

২. কুরআনুল কারীম স্পর্শ করা ।

 

হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা বলেন, পবিত্র না হয়ে কুরআন কারীম স্পর্শ করবে না। (দারা কুতনী: ৪৩১)

 

৩. কোরআন তেলাওয়াত করা ।

 

হযরত আলী রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা সর্বদা আমাদেরকে কুরআন পড়িয়েছেন, তবে যখন বড় নাপাকি অবস্থায় থাকতেন সে সময় ছাড়া।‌ (তিরমিযী: ১৪৬, আহমদ: ১০১৪)

 

৪. মসজিদে অবস্থান ।

 

নাপাক অবস্থায় মসজিদে গমন বা মসজিদে অবস্থান করা ‌যাবে না । (আবু দাউদ: ২৩২)।

 

৫. কাবা ঘর তাওয়াফ করা

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অর্থাৎ আল্লাহর ঘর কাবায় তাওয়াফ করা নামায আদায় তুল্য।‌ (সুনানে নাসাঈ: ২৯২০)

ফরজ গোসল করা ছাড়া প্রয়োজনে অন্য কাজ করতে হলে গোপনাঙ্গ ধুয়ে নেওয়া এবং অযু করে নেওয়া জরুরী ।

 

হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানাবাতের (ফরজ গোসল) অবস্থায় পানাহার কিংবা ঘুমানোর ইচ্ছা করলে নামাজের অজু করে নিতেন । ( সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০৫)

স্মরণ রাখতে হবে ফরজ গোসল বিলম্বিত হওয়ার কারণে যদি নামাজ কাজা হয়ে যায় তাহলে আপনাদেরকে গুনাগার হতে হবে।‌ অতএব লজ্জা এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয় ।‌ সুতরাং এ ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন করা জরুরী ।

 

আচ্ছা কেউ যদি ফরজ গোসল থাকা অবস্থায় ভুলে নামাজ আদায় করে থাকে তাহলে সে কি করবে ?

 

উত্তর হল গোসল ফরয থাকা অবস্থায় নামাজ পড়লে সে নামাজ আদায় হয় না । নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য পবিত্র হওয়া আবশ্যক । তাই গোসল ফরয থাকা অবস্থায় যত ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো হয়েছে সবকটি নামাজ কাযা করতে হবে ।

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইরশাদ করেছেন, নামাযের চাবি হল পবিত্রতা। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১০০৬, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৭৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীসনং-৬১)

আরো একটি প্রশ্ন কেউ আপনাদের করতে পারে কিংবা নিজেদের মনে জাগতে পারে । আর সেটি হচ্ছে

 

গোসল ফরজ অবস্থায় কোনো কিছু স্পর্শ করলে উক্ত বস্তু নাপাক হবে কিনা ?

 

সহজ জবাব হলো গোসল ফরজ অবস্থায় কোনো কিছু স্পর্শ করলে উক্ত বস্তু নাপাক হবে না ।  হ্যাঁ যদি হাতে নাপাক লেগে থাকে আর উক্ত নাপাকিসহ কোথাও ধরা হয় আর উক্ত স্থানে নাপাক লেগে যায় । তাহলেই কেবল উক্ত স্থানটি নাপাক হবে ।

 

গোসল সম্পর্কে হাদীস ‌

 

 

১ নং হাদীস:

 

হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন তার সঙ্গে মদিনার কোন এক পথে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু সাল্লামের দেখা হলো । আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআলা তখন জানাবাতের (ফরজ গোসল অবস্থায় )ছিলেন । তিনি বলেন আমি নিজেকে নাপাক মনে করে সরে পড়লাম । পরে আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু গোসল করে এলেন । পুনরায় সাক্ষাত হলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন আপনারা কোথায় ছিলে? আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু ‌বললেন ,আমি জানাবাতের অবস্থায় আপনার সঙ্গে দেখা করা মনে করেনি ।‌নবীজি সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বললেন ‌-

سبحان الله ، إن المسلم لا ينجس

সুবাহানাল্লাহ্! মু’মিন নাপাক হয় না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৯)

 

২. নং হাদীস:

হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জানাবাতের গোসল করতেন তখন প্রথমে তিনি দুই হাত ধুয়ে নিতেন। তারপর নামাজের ন্যায় অযু করতেন । তার পর গোসলের সময় হাতের আংগুল চুল খিলাল করতেন । তারপর চামড়া ভিজে গেছে বলে নিশ্চিত হলে তিনবার শরীরে পানি ঢালতেন । অতঃপর সমস্ত শরীর ধুয়ে ফেলবেন । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭২ )

৩. নং হাদীস:

হযরত আয়েশা রাদিইল্লাহু তা’আলা আনহা থেকে বর্ণিত । আমাদের মধ্যে কারও ফরজ গোসলের প্রয়োজন হলে সে দুইহাতে পানি নিয়ে মাথায় তিনবার ঢালতেন । তারপর একহাত দিয়ে ডান দিকে এবং অপর হাত দিয়ে মাথার বাম পাশে পানি ঢালতেন ।

 

( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮)

 

৪ নং হাদীস:

 

হযরত মায়মুনা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সালাতের অযুর ন্যায় অজু করলেন। পাদুটো ব্যতীত এবং তার লজ্জাস্থান ও যে যে স্থানে নোংরা লেগেছে তা ধুয়ে নিলেন । অতঃপর নিজের উপর পানি ঢেলে দেন । অতপর সেখান হতে সরে গিয়ে পা দুটো ধুয়ে নেন । এ ছিল তার জানাবাতের গোসল ।

( মুসলিম ৩/৯, হাঃ ৩১৭, আহমাদ ২৬৮৬১)

 

 

বিদায়ের পূর্বে কথাঃ

 

প্রিয় পাঠক । হয়তো ৫ মিনিট বা বেশি সময় নিয়েছি । আসলে বিষয়টা কে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্যেই এমনটি হয়েছে। আপনারা উপকৃত হলে আমিও ধন্য হব । আপনাদের যদি আরো কোন প্রশ্ন থেকে থাকে গোসল কিংবা অন্যান্য বিষয়ে তাহলে আমাদের জানান । আপনাদের চাওয়া অনুযায়ী নির্ধারিত টপিক নিয়ে হাজির হব ইনশাআল্লাহ ‌। আপাতত ভাল থাকুন । সুস্থ থাকুন । শীর্ষবার্তার সঙ্গে থাকুন । আল্লাহ হাফেজ ‌।

 

 

 

 

- Advertisement -