বাহাত্তর দল জাহান্নামী তবে জান্নাতী দল কোনটি? | দীদার মাহদী

0 110

- Advertisement -

মুসলিম একটি জাতি গোষ্ঠী ৷ মুসলিমরাই আল্লাহর অনুগত ও প্রিয় বান্দা ৷ কিন্তু যুগে যুগে এই মুসলিমদের মাঝে নানা বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে ৷ এটা চলমান আছে ৷ মতপার্থক্য করতে গিয়ে বিভিন্ন ফিরকার জন্ম হয়েছে ৷ এর মধ্যে কতিপয় তো এমন যারা মূলত ইসলাম থেকেই সিটকে পড়েছে ৷ আলোচনায় প্রবেশের আগে একটি হাদীস পড়ে নিই ৷

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى، قَالاَ حَدَّثَنَا أَبُو الْمُغِيرَةِ، حَدَّثَنَا صَفْوَانُ، ح وَحَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عُثْمَانَ، حَدَّثَنَا بَقِيَّةُ، قَالَ حَدَّثَنِي صَفْوَانُ، نَحْوَهُ قَالَ حَدَّثَنِي أَزْهَرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْحَرَازِيُّ، عَنْ أَبِي عَامِرٍ الْهَوْزَنِيِّ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ، أَنَّهُ قَامَ فِينَا فَقَالَ أَلاَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَامَ فِينَا فَقَالَ ‏”‏ أَلاَ إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَهِيَ الْجَمَاعَةُ ‏”‏ ‏.‏ زَادَ ابْنُ يَحْيَى وَعَمْرٌو فِي حَدِيثَيْهِمَا ‏”‏ وَإِنَّهُ سَيَخْرُجُ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ تَجَارَى بِهِمْ تِلْكَ الأَهْوَاءُ كَمَا يَتَجَارَى الْكَلْبُ لِصَاحِبِهِ ‏”‏ ‏.‏ وَقَالَ عَمْرٌو ‏”‏ الْكَلْبُ بِصَاحِبِهِ لاَ يَبْقَى مِنْهُ عِرْقٌ وَلاَ مَفْصِلٌ إِلاَّ دَخَلَهُ ‏”‏ ‏.‏

মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, জেনে রাখো! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন, জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে এবং এ উম্মাত অদূর ভবিষ্যতে তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে এবং একটি জান্নাতে যাবে। আর সে দল হচ্ছে আল-জামা’আত। ইবনু ইয়াহ্‌ইয়া ও ‘আমর (রহঃ) বলেনঃ “বিষয়টি হল, আমার উম্মাতের মধ্যে এমন এমন দলের আবির্ভাব ঘটবে যাদের সর্বশরীরে (বিদ’আতের) প্রবৃত্তি এমনভাবে অনুপ্রবেশ করবে যেমন পাগলা কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক রোগীর সর্বশরীরে সঞ্চারিত হয়।

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৫৯৭

একটি দল হবে জান্নাতি ৷ বাকিগুলো জাহান্নামী ৷ দল বলতে এখানে রাজনৈতিক দলের কথা বলা হয়নি ৷ বরং ইসলামের নামে নতুন কোনো মতবাদ চালু করা যার অস্তিত্ব ইসলামে নাই ৷ কুরআন সুন্নাহ বিরোধী ৷ এমন কি এই মতবাদ নিয়ে একটি গ্রুপ দাঁড়িয়ে যায় ৷ সুতরাং সহীহ দলটি আমাদের চেনা দরকার ৷ আমাদের মুক্তির জন্যই এটা প্রয়োজন ৷

কুরআন দিয়ে শুরু করি ৷ মহান আল্লাহ জানান,
اهدنا الصراط المستقیم-صراط الذین انعمت علیهم –

(হে আল্লাহ) “আমাদেরকে সোজা পথে চালাও; তাঁদেরই পথে, যাদের উপর তুমি ইহসান করেছ।”

এ আয়াতে “সিরাতুল মুস্তাকীম” বা সোজা পথ দ্বারা ইসলাম, কোরআন, রাসূল সাঃ এর অনুপম চরিত্র, তাঁর বংশধর, সাহাবা কেরামকে বুঝানো হয়েছে। অতএব বুঝা যায়, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতই সিরাতে মুস্তাকীম’। কারণ এ দল ইসলামের যাবতীয় বিধান, পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ, আহলে বাইত, সাহাবা কেরাম সবাইকে যথাযথভাবে মানে। আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা অপর আয়াতে অতি স্পষ্টভাবে করা হয়েছে-

ومن يطع الله والرسول فأولئك مع الذين أنعم الله عليهم من النبيين والصديقين والشهداء والصالحين وحسن أولئك رفيقا\” [النساء: 69]

অর্থাৎ “যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে তারা ঐসব ব্যক্তির সাথে থাকবেন যাঁদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। (তাঁরা হলেন) নবীগণ সিদ্দিকীন, শহীদান ও সালেহীন। তাঁরা অতি উত্তম সঙ্গী।”( সুরা নিসা-৬৯-আল-কোরআন )।

আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর সুস্পষ্টভাষায় ব্যাখ্যা দান করেছেন যে, এ চার শ্রেণীর প্রিয় বান্দাদের পথের নাম সিরাতে মুস্তাকীম। কারণ, তাঁরাই হলেন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত। সুতরাং যে দলের আক্বীদা ও আমল উল্লেখিত চার শ্রেণীর মতো হবে তারাই হবে সিরাতে মুস্তাকীম’-এর উপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব, নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতই সিরাতে মুস্তাকীম। এ দলই উল্লেখিত চার শ্রেণীর প্রকৃত অনুসারী। আর যতো ‘বাতিল ফিরকা’ বা ভ্রান্ত দল-উপদল রয়েছে তারা উল্লেখিত চার শ্রেণীর কোন না কোনটার মহান মর্যাদায় আঘাত হেনেছে অত্যন্ত সুকৌশলে। সুতারাং তারা বাহ্যিক চাল চলনে বা মৌখিকভাবে তাদের অনুসারী দাবী করলেও নিঃসন্দেহে তারা বন্ধুরূপী শত্রু।

উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তি অনুগত ও অনুসরণীয় হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবার জন্য তার খোদাপ্রদত্ত মর্যাদা অটুট থাকতে হবে এবং অনুসারীদের নিকট অতীব সম্মানিত বলে বিবেচিত হতে হবে। অন্যথায় অনুগত হবে না ও অনুসরণীয় বলে বিবেচিত হবে না।

(১)সিরাতে মুস্তাকীম ‘বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আাতকে বুঝায়। কারণ এটা চরম ও নরমের মধ্যবর্তী পথ।

ﻭَﺍﻋْﺘَﺼِﻤُﻮﺍ ﺑِﺤَﺒْﻞِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺟَﻤِﻴﻌًﺎ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻔَﺮَّﻗُﻮﺍ ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭﺍ ﻧِﻌْﻤَﺔَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺇِﺫْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺃَﻋْﺪَﺍﺀً ﻓَﺄَﻟَّﻒَ ﺑَﻴْﻦَ ﻗُﻠُﻮﺑِﻜُﻢْ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤْﺘُﻢْ ﺑِﻨِﻌْﻤَﺘِﻪِ ﺇِﺧْﻮَﺍﻧًﺎ ﻭَﻛُﻨْﺘُﻢْ ﻋَﻠَﻰ ﺷَﻔَﺎ ﺣُﻔْﺮَﺓٍ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ﻓَﺄَﻧْﻘَﺬَﻛُﻢْ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻳُﺒَﻴِّﻦُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻟَﻜُﻢْ ﺁَﻳَﺎﺗِﻪِ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﻬْﺘَﺪُﻭﻥَ ‏( 103 )

অর্থাৎ-“তোমরা সবাই আল্লাহর রশ্মিকে দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহই তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে নিজের নিদর্শন তুলে ধরেন, যেন তোমরা সুপথ পাও।”(সুরা আল ইমরান -১০৩)

(وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا)

আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার কথা বলার পর তার রশি সকলকে শক্তভাবে ধারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এ কথা দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দু’টি মূলনীতিতে মুক্তি নিহিত: ১. আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা। ২. সকলে দীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ থাকা। হাবলুল্লাহ হল পবিত্র কুরআন ও দীন ইসলাম। যদিও এছাড়া অনেক তাফসীর পাওয়া যায়। তবে এটাই সঠিক। (আয়সারুত তাফসীর ১/২৯৪)

(وَّلَا تَفَرَّقُوْا)

আল্লাহ তা‘আলা জামা‘আতবদ্ধ হয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। দলে দলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। যারা দীনের মধ্যে মতভেদ, ফিরকাহ বা দল-উপদল সৃষ্টি করে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(إِنَّ الَّذِيْنَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَكَانُوْا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِيْ شَيْءٍ)

“নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দীনকে (বিভিন্ন মতে) খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়।” (সূরা আন‘আম ৬:১৫৯)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা তিন কাজে তোমাদের প্রতি খুশি হন, আর তিন কাজ অপছন্দ করেন। যে তিনটি কাজে খুশি হন তা হল:

- Advertisement -

১. তোমরা এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।

২. আল্লাহ তা‘আলার রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং দলে দলে বিভক্ত হবে না।

৩. যারা তোমাদের দায়িত্বশীল হবে তাদের কল্যাণ কামনা করবে।

আর যে তিনটি কাজ তিনি অপছন্দ করেন তা হল-

১. অনর্থক কথা-বার্তা বলা।

২. সম্পদ নষ্ট করা এবং ৩. বেশি বেশি প্রশ্ন করা। (সহীহ মুসলিম হা: ৪৫৭৮, মুসনাদ আহমাদ: ৮৭৯৯)

অতএব ইসলামের নামে দল-উপদল সৃষ্টি না করে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে দেন। জাহিলী যুগে আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধ, রক্তক্ষয়ী বিগ্রহ ও কঠিন শত্র“তা ছিল। অতঃপর যখন গোত্রদ্বয় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় তখন আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহে তারা পূর্বের সবকিছু ভুলে গিয়ে ভাই-ভাইয়ে পরিণত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা এই দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:

(وَاِنْ یُّرِیْدُوْٓا اَنْ یَّخْدَعُوْکَ فَاِنَّ حَسْبَکَ اللہُﺚ ھُوَ الَّذِیْٓ اَیَّدَکَ بِنَصْرِھ۪ وَبِالْمُؤْمِنِیْنَﮍﺫوَاَلَّفَ بَیْنَ قُلُوْبِھِمْﺚ لَوْ اَنْفَقْتَ مَا فِی الْاَرْضِ جَمِیْعًا مَّآ اَلَّفْتَ بَیْنَ قُلُوْبِھِمْ ﺫوَلٰکِنَّ اللہَ اَلَّفَ بَیْنَھُمْ)

“তিনি তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা শক্তিশালী করেছেন, এবং তিনি তাদের পরস্পরের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন।” (সূরা আনফাল ৮:৬২-৬৩)

তাই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তোমরা তো ছিলে জাহান্নামের কিনারে। তিনি ইসলামের প্রতি হিদায়াত দিয়ে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন।

মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে যে, কোরআন আল্লাহর রজ্জু, যে তার অনুসরণ করেছে সে হিদায়তের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর যে কোরআন – এর অনুসরণ ছেড়েছে সে ভ্রষ্টতার উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ তা’আলা আনহু বলেন, ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে আল-জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। তিনি আবার বলেন, “ঐ জামা’আতকে অবশ্যই অবলম্বন করো, এটা ‘আল্লাহর রজ্জু’ যাকে শক্তভাবে আকড়ে ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে”। (খাযাইনুল ইরফান)। কেউ বলেন, ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে দ্বীন ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। (জালালাইন শরীফ ও তাফসীরে হোসাইনী। ولاتفرقو বলে আল্লাহ তা’আলা ঈমানদারগণকে ইয়াহুদী, নাসারার মত বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। এতদসত্ত্বেও মুসলমানগণ অসংখ্য দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় ‘আল্লাহর রজ্জু’ হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতই হবে যথার্থ । এটাই হলো ইসলামের মূলধারা একমাত্র সঠিক রূপরেখা। পবিত্র হাদিসের আলোকে যারা এ দলের বাইরে থাকবে তারা নিঃসন্দেহে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ব্যতীত প্রত্যেক ভ্রান্ত দলই কোরআনের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছে। সুতরাং তারা কোরআনুল করিমের সঠিক অনুসারী হতে পারে না। অনুরূপভাবে প্রত্যেক বাতিল ফিরকা দ্বীন ইসলামের নামে নিজেদের ভ্রান্ত ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। অতএব, তারা দীন ইসলামের সঠিক অনুসারীও নয়। একমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতই আল্লাহু, তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা
কেরামের নির্দেশিত পন্থায় পবিত্র কোরআন ও দ্বীন ইসলামের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে। ইমাম বুসিরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতে ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে হুযুর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্ত্বাকে বুঝানো হয়েছে। তিনি “কাসীদা-এ-বোরদায়” বলেন-

دعا الى الله فالمستمسكون به -مستمسكون بحبل غير منفصم

অর্থাৎ তিনি (হুযুর করিম সাল্লাল্লাহ তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ’র দিকে আহবান করেছেন। অতঃপর তার মহান আদর্শকে মজবুদভাবে ধারণকারীগণ এমন এক রজ্জুকে শক্তভাবে আকড়ে ধরেছে যা ছিন্ন হবার নয়। এখানে ইমাম বুসিরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ইংগিত করেছেন যে, ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে হযুর করিম সাল্লাল্লাহ তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের
মহান সত্ত্বাকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা তাঁর মহান মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁর অনুপম আদর্শকে আকড়ে ধরবে তারা কখনো সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তাদের সম্পর্কে প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাথে অটুট থাকবে। একমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতই মহানবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার প্রতি অকৃত্রিমভাবে যত্নবান ও তাঁর আদর্শের যথার্থ অনুসারী। পক্ষান্তরে – বাতিল ফিরকা বাহ্যিক চাল – চলনে নিজেদেরকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহ তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী বলে তাদের লিখনী ও বক্তৃতা বিবৃতিতে মহানবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুউচ্চ মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করছে চরমভাবে। সুতরাং তারা রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের অকৃত্রিম অনুসারী নয়, বরং তাদের বাহ্যিক চাল-চলন সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে ধোঁকায় ফেলার কুট কৌশল মাত্র।

ومن يسابق الله من بعد ما تبين لم الهدى ويتبع غير سبيل المؤ منين نزله ما تولى ونجله جهنم سا ءت مصيرا

অর্থাৎ “যে ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধীতা করবে তার নিকট সত্য পথ উদ্ভাসিত হবার পর এবং মুসলমানদের পথ ছেড়ে অন্যপথ অনুসরণ করবে আমি তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দেব। এবং তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো। আর তা কতইনা নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরা নিসা-১৫৫)

আলোচ্য আয়াতে ‘সাবিলুল মোমেনীন’ বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতকে বুঝানো হয়েছে। কারণ সাহাবা কেরাম, তাবেয়ী, তবই তাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহেদীন, মুজাদ্দেদীন, মুফাসসেরীন, মুহাদ্দেসীন, ফোকাহা, আউলিয়া কেরাম এবং বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমানই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতেরই অনুসারী। যারা এদলের বাইরে অন্য পথ ও মতে চলবে তারা জাহান্নামী। (খাযাঈনুল ইরফান ও তাফসীরে হোসাইনী)

ان هذا صراط مستقيما لا تبعده ولا اتبعوا السبل فغفر قوا بكم عن سبيله- ذلكم ولكم به لعلكم تتقون-

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটা আমার সরলসোজা পথ, তোমরা এ পথে চলো, অন্য পথসমূহে চলো না। কেননা তোমাদেরকে তাঁর (আল্লাহ) পথ থেকে পৃথক করে ফেলবে। এটা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার।” (সুরা আনআম- ১৫৪)।

আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ ঈমানদারগণকে ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ – এর অনুসরণ করার নির্দেশদানের পাশাপাশি প্রান্ত ধর্ম ও দলগুলোর অনুসরণ করতে নিষেধও করেছেন। কারণ, ঐ সব পথে চললে ‘সিরাতে মুস্তাকীম ‘ হতে দূরে সরে পড়বে।

আলোচ্য আয়াতে “অন্য পথসমূহ অনুসরণ করো না” বলতে কোন পথগুলোকে বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে তাফসীরকারকগণ বলেন, সবুল’ (পথসমূহ) দ্বারা। ইয়াহদীয়াত, নাসরানীয়াত (খৃষ্টবাদ) ও কুপ্রবৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত পথ-মত সমূহকে বুঝানো হয়েছে (বায়যাভী শরীফ)। শয়তানের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে মুসলিম মিল্লাতকে খণ্ডবিখও করার মানসে যে সব ফিরকার আবির্ভাব ঘটেছে তা কু-প্ৰবৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং আলোচ্য আয়াতে সিরাতুল মুস্তাকীম’-এর যথার্থ ব্যাখ্যা হবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং ‘সুবুল’ (বলতে পথসমূহ) ইয়াহুদীয়াত ও নাসরানীয়াতের এবং মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট বাতিল ফিরকাসমূহ। কারণ অদ্যাবধি আবির্ভূত সকল বাতিল ফিরকার পেছনে হয়তো ইয়াহুদীয়াতের হাত রয়েছে অথবা নাসরানীয়াতের। ইসলামের প্রাথমিক যুগগুলোতে যাদের মাধ্যমে দলাদলি সূচনা হলো তাদের মধ্যে ইবনে সাবা অন্যতম। সে মূলতঃ ইয়াহুদী ছিল। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অশুভ উদ্দদেশ্যে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল একথা ঐতিহাসিক সত্য। আলোচ্য আয়াতসমূহে সিরাতে মুস্তাকীম, ‘হাবলুল্লাহ’ ও ‘সাবলুল’ ‘মো’মেনীন’ দ্বারা আহলে সুন্নাত ওয়াল।জামাআতকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাখ্যায় কেউ কেউ আপত্তি উথাপন করার সুযোগ খুঁজে বলে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত নামটাতো তাবেয়ীনের যুগে প্রকাশ পেয়েছে। আর কোরআনুল করীমতো আরো অনেক আগে নাযিল হয়েছে। সুতরাং এটা অপব্যাখ্যা বা মনগড়া। এর উত্তর দু’ভাবে দেয়া যায়।

★প্রথমতঃ পবিত্র কোরআন মহা প্রজ্ঞাময় আল্লাহর বাণী। এতে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, ইহকাল, পরকাল সবকিছুর প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী বিদ্যমান। দ্বীন-ইসলামের মুখোশ পরে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ থেকে পদচ্যুত করার লক্ষ্যে বাতিল দল-উপদলের আবির্ভাব হয়েছে; এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পবিত্র কোরআন কোন বক্তব্য রাখবে না, তা হতে পারে না । এসব আয়াতে মহান আল্লাহু মূলতঃ প্ৰকৃত মুসলমানদেরকে ইসলামের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতিই দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। আর সে মূলধারাকে পবিত্র কোরআনে সিরাতে মুস্তাকীম ‘‘হাবলুল্লাহ’ আবার কোন আয়াতে ‘সাবিলুল মোমেনীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

★দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্ তাআলার একমাত্র মনোনীত দ্বীন “আল-ইসলাম’। সর্বশেষ নবী হুযুর করিম সাল্লাল্লাহ তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের মাধ্যমে এর পরিপূর্ণতা ঘটে। অতঃপর ইসলাম বিরোধী অপশক্তি ইসলামের মূলধারা থেকে মুসলমানদেরকে বিচ্যুত করার মানসে ইসলামের নামেই যখন মুসলমানদের মধ্যে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটায়, তখন সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা রক্ষার প্রয়োজনে ইসলামের মূলধারার পৃথক নাম করণের প্রয়োজনীয়তা প্রকটভাবে দেখা দেয়। আর তা “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত’ নামে অদ্যাবধি পরিচিতি ও স্বীকৃতি লাভ করে আসছে। সুতরাং আলোচ্য আয়াতসমূহে সিরাতে মুস্তাকীম’ হাবলুল্লাহ’ ও ‘সাবলুল মোমেনীন’এর মর্মার্থ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতা গ্রহণ করা মনগড়া নয়, বরং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট মহান বাণীরই প্রকৃত ব্যাখ্যা।

দীদার মাহদী
ভাইস প্রিন্সিপ্যাল
দারুলহুদা মডেল মাদরাসা
কোদালপুর, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর ৷

- Advertisement -

error: Content is protected !!