- Advertisement -

- Advertisement -

ইসলাম ও বিজ্ঞানের আলোকে মিসওয়াক করার গুরুত্ব ও ফজিলত

85

মিসওয়াক

সূচিপত্র

মিসওয়াকের গুরুত্ব ও ফজিলতঃ

প্রকৃতি কখনো মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ নয় বরং তা সর্বদাই মানব স্বভাবের অনুকূল ৷ শুধু তাই নয় মানুষ যখন দুনিয়ার চাকচিক্য ও ভোগ বিলাসিতায় ডুবে গিয়ে এক সময় নানা বিপদের সম্মুখীন হয় এবং তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোনরূপ উপায়ন্তর না দেখে পুনরায় প্রকৃতির দিকে ফিরে আসে প্রকৃতি তখনো মানুষকে পূর্বের মতো উপকার করে থাকে ৷

চমকদার ও মহা মূল্যবান হীরের টুকরো কে ফেলে দিয়ে সামান্য একটুকরো কাঁচখন্ড গ্রহণ করা যেমনিভাবে বুদ্ধিহীনতা ও বোকামি ঠিক তেমনি মিসওয়াকের মত স্বভাবসুলভ আমলটিকে পরিত্যাগ করাও অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিচয় ৷

যখন থেকে আমরা এ মহা নেয়ামতটিকে হাতছাড়া করেছি তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমরা নানাভাবে পেরেশান হচ্ছি ৷ হাজার হাজার টাকা নষ্ট করেও দৈহিক সুস্থতার উৎসমূলে ফিরে যেতে সক্ষম হচ্ছি না ৷

মিসওয়াক সম্পর্কে একজন জ্ঞানী ব্যক্তির উক্তি করেছেন ‘যেদিন থেকে আমরা মেসওয়াকের ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি সেদিন থেকেই ডেন্টাল সার্জন এর সূত্রপাত হয়েছে ৷’ এবার আসুন আমরা একটা পরীক্ষা করে দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সুন্নাহ  মানুষের স্বভাব সুলভ কিনা ৷ এ সুন্নাহ তাদের উন্নতির প্রতিবন্ধক না পথপ্রদর্শক? আমাদেরকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায় না বিজ্ঞানের নিকটবর্তী করে দেয়? ফয়সালা আপনার হাতে ছেড়ে দেওয়া হল গভীর মনোযোগ সহকারে পুরো লেখাটি পড়ুন এবং নিজেই ৷

মেসওয়াক শব্দের অর্থ

মিসওয়াক শব্দটি সিওয়াক (اسواك) শব্দমূল থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হল ঘষা, মাজা বা মর্দন করা। এর সবচেয়ে কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দ হল দাঁতন। ইসলামি পরিভাষায়, দাঁত থেকে হলুদ বর্ণ বা এ জাতীয় ময়লা দূর করার জন্য কাঠ বা গাছের ডাল ব্যবহার করাকে মিসওয়াক বলে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হওয়ায় এটি বাংলা ভাষার ও একটি শব্দ। এটি ‘মেসওয়াক’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে।

মিসওয়াক কখন করতে হয়?

হাদিস পর্যালোচনা ও গবেষণায় দেখা যায় যে নিয়মিত

১। ওযুর সময় মিসওয়াক করা,
২। খাবারের পরে মিসওয়াক করা,
৩। ঘুমানোর পূর্বে ও পরে মিসওয়াক করা,
৪। নামাযের পূর্বে মিসওয়াক করা দাঁত ও দেহের জন্য খুবই উপযোগী।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম রাতে ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াক করতেন ৷ রাতে শয়নকালে মিসওয়াক করা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ইসলামের মহান অভ্যাস ৷ -যাদুল মাআদ

বর্তমানে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা পরামর্শ দেন রাতে ব্রাশ করে ঘুমাতে ৷ সমসাময়িক গবেষণা বলছে, মানুষ যা ভক্ষণ করছে তার ময়লা কুলির দ্বারা পরিপূর্ণ ভাবে পরিষ্কার হয় না ৷ সাধারণত মানুষের দাঁত নষ্ট হয় শয়নকালে ৷

এর কারণ হচ্ছে, আপনি প্রত্যক্ষ করে থাকবেন, দিনের বেলায় মানুষ কখনো কথা বলছে ৷ কখনো আহার করছে ৷ আবার কখনো পান করছে ৷

তাই দিনের বেলায় মুখের গতিশীলতার কারণে রক্ত রস বা রক্ত লসিকা তার কাজ করার সুযোগ পায় না ৷ কিন্তু রাতের বেলা যখন মুখ বন্ধ হয়ে যায় তখন তার সুযোগ এসে যায় কাজ করার ৷

এ কারণেই দাঁত রাতের বেলায় অধিক খারাপ হয় ৷ সুতরাং সকালে টুথপেস্ট ব্যবহার করুন আর নাই করুন রাতে শোয়ার সময় অবশ্যই মেসওয়াক করে ঘুমাবেন ৷

মেসওয়াকের সুন্নাত কী?

মেসওয়াসের মাঝে দুটি বিষয় সুন্নত,
এক. মুখ পরিষ্কার করা।
দুই. গাছের ডাল হওয়া।
তাই গাছের ডাল ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে দাঁত মাজলে একটি সুন্নত আদায় হবে। অপরটি হবেনা। সুতরাং মেসওয়াক না থাকলে আঙ্গুল ও শুকনো কাপড় দ্বারাও মেসওয়াক করা যেতে পারে। ব্রাশের মাধ্যমেও দাঁত মাজা যেতে পারে।

ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর ও ঘুমানোর পূর্বে, নামাজের আগে, মজলিসে উপস্থিত হবার পূর্বে, কুরআন ও হাদীস পাঠের পূর্বে, খাওয়ার পর মেসওয়াক করা মুস্তাহাব

মেসওয়াক নিয়ে হাদীস

প্রিয়নবির ভাষায়, ‘মেসওয়াক মুখের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায়।’ (বুখারি, মিশকাত)

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেসওয়াক করার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণনা করেন-

‘মেসওয়াকবিহীন নামাজের চেয়ে মেসওয়াক করে যে নামাজ আদায় করা হয়, তাতে সত্তর গুণ বেশি ফজিলত রয়েছে।’ (বায়হাকি)

মেসওয়াকের গুরুত্ব তুলে ধরে অন্য হাদিসে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেন-

‘কখনো এমন হয়নি যে, জিবরিল আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসেছেন; অথচ আমাকে মেসওয়াক করতে বলেননি। এতে আমার আশংকা হতো মেসওয়াকের কারণে আমার মুখে অগ্রভাগ ছিন্ন-ভিন্ন করে না ফেলি।’ (মুসনাদে আহমদ, মিশকাত)

নামাজের পূর্বে মেসওয়াক

প্রকৃতপক্ষে নামাজ যেহেতু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের গুণগান করা তাই নামাজের সময় মুখ পরিষ্কার থাকা অত্যাবশ্যক ৷ যদি আহারের পর মেসওয়াক বিহীন অজু করে নামাজ আদায় করা হয় তাহলে দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো নামাজের একাগ্রতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে ৷

তাছাড়া নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় নামাজী ব্যক্তির মুখ থেকে যদি দুর্গন্ধ বের হয় তাহলে তার দ্বারা অন্য নামাজিদের কষ্ট হয় ৷ তাই মেসওয়াক দ্বারা মুখের দুর্গন্ধ দূর করে নেয়া উচিত ৷ আর মিসওয়াক করার সময় মুখ এমনভাবে হিল্লোলিত হয় যদ্দরুন কোরআন তেলাওয়াত তাসবীহ-তাহলিল ইত্যাদিতে পাওয়া যায় অনাবিল প্রশান্তি ৷

নামাজ হলো মহান সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে হাজিরা দেয়া ৷ আর সেই বিশেষ সময় যদি মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয় তাহলে তা হবে লজ্জার কারণ ৷

মেসওয়াক নিয়ে গুরু নানকের মন্তব্য

কথিত আছে তিনি সর্বদা হাতে মিসওয়াক রাখতেন এবং মিসওয়াক করতেন ৷ তিনি বলতেন ‘হয়তো এ লাকড়ি (মেসওয়াক) গ্রহণ করো নতুবা রোগকে বরণ করো ৷’

 

ব্রাশ নাকি মেসওয়াক বিজ্ঞান কী বলে?

 

ব্রাশ ও মেসওয়াক এর মধ্যে পার্থক্য

এখানে একটি প্রশ্ন জাগে যে দাঁতের পরিছন্নতা ও সুরক্ষার জন্য বেশি প্রয়োজনীয় ব্রাশ নাকি মিসওয়াক? আমরা এখানে সর্বপ্রথম ব্রাশের উপকারিতা ও ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করব ৷

জীবাণু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে একবার ব্যবহার করা ব্রাশ স্বাস্থ্যের জন্য তখনই ক্ষতিকর যখন দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হয় ৷ কেননা ব্যবহারের দ্বারা তার মধ্যে জীবাণুর ভিত্তি স্থাপিত হয় ৷

পানি দ্বারা পরিষ্কার করলেও তা থাকে ক্রমবর্ধমান ৷ তাছাড়া দাঁতের উপরের উজ্জ্বল স্তরকে দূরীভূত করে দেয় ৷ ফলে দাঁতের মাঝে ফাঁকা সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে দাঁতগুলো মাড়ি থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় ৷ আর খাবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো দাঁতের ফাঁকে জমে মাড়ি ও দাঁতের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ৷

 

মেসওয়াক

এমন বৃক্ষের মেসওয়াক দাঁতের জন্য উপযোগী যার আঁশগুলো কোমল ৷ যা দাঁতের মাঝে ফাঁকা বৃদ্ধি করে না এবং মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে না ৷ তিনটি গাছের ডাল মেসওয়াকের জন্য উপযোগী ৷

নিমগাছ ৷ বাবলা গাছ ৷ বিলু গাছ ৷ বিলু গাছের বিভিন্ন উপকারিতা আছে ৷ এর আঁশগুলো মসৃণ ৷ এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস ৷

ভূতত্ত্ববিদগণের আধুনিক রিসার্চ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে মস্তিষ্কের অসংখ্য খোরাক এবং সব বস্তুর মধ্যে ফসফরাস অন্যতম ৷ আরে ফসফরাস মুখের লোমকূপ এর সাহায্যে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় ফলে মস্তিষ্কের শক্তি সঞ্চিত হয় ৷

 

- Advertisement -

মেসওয়াক করার পদ্ধতি

মিসওয়াক করার সুন্নত পদ্ধতি হলো, ডান হাতে মিসওয়াক নিয়ে ডান দিক থেকে মিসওয়াক শুরু করা। দাঁতে প্রস্থে ও জিহ্বায় লম্বালম্বি মিসওয়াক করা সুন্নত। উল্লেখ্য, মিসওয়াক কনিষ্ঠ আঙুল পরিমাণ মোটা ও এক বিঘত পরিমাণ লম্বা হওয়া মুস্তাহাব এবং মিসওয়াক নিম বা জয়তুনগাছের ডাল হওয়া উত্তম। (আল বিনায়াহ : ১/২০৪, আদ্দুররুল মুখতার : ১/১১৩, রদ্দুল মুহতার ১/১১৪, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ৩/৪৪)।

মিসওয়াক করার পদ্ধতি

মিসওয়াক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানঃ

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তার মৌখিক পরিচ্ছন্নতা বৈশিষ্ট্য এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটা সমর্থন করেছে যে, মিসওয়াক ব্যাবহারের দ্বারা ব্যাকটেরিয়া ও প্লেক রোগ প্রতিরোধ হয়। এছাড়াও  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডেন্টাল স্বাস্থ্যবিধির জন্য একটি ভাল হাতিয়ার হিসেবে মিসওয়াক ব্যবহার খুবই উপযোগী। এছাড়াও

১। মিসওয়াক মুখ পরিষ্কার করে,
২। মুখের লালাস্রাব বৃদ্ধি করে যার ফলে শুষ্ক মুখ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়,
৩। Healing dental tissue নিয়ন্ত্রণ করে,
৪। মুখের মধ্যে বিল্ড আপ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে,
৫। মুখের ব্যাকটেরিয়া জনিত আঠা রোগ দূর করে,
৬। নিঃশ্বাসের সাথে বের হওয়া দুর্গন্ধ দূর করে।।

 

মেসওয়াক করার উপকারিতা

 

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সমস্ত সুন্নাহর মাঝে এই একটিমাত্র সুন্নাহ যা আমাকে সবচেয়ে বিস্মিত করে। অবাক হওয়ার কারণ নিম্নোক্ত হাদীসঃ عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ شُرَيْحٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ قُلْتُ بِأَىِّ شَىْءٍ كَانَ يَبْدَأُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ بَيْتَهُ قَالَتْ بِالسِّوَاكِ ‏
অর্থঃ মিক্বদাম-এর পিতা শুরায়হ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, রসূলুল্লাহ(সাঃ) তাঁর ঘরে ঢুকে সর্বপ্রথম কোন্‌ কাজটি করতেন? তিনি বললেন, “সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন”। (মুসলিমঃ৪৭৮)।

মিসওয়াক করার উপকারিতা 

মিসওয়াক করার উপকারিতা

ছোট্ট ও সাদামাটা এই হাদীসটির মাঝে গভীর চিন্তার খোরাক রয়েছে। মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন একাধারে একজন রাষ্ট্রপতি, সমরনায়ক, প্রধান কূটনীতিক, সকল সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ের প্রধান, প্রধান আইনজ্ঞ ও বিচারপতি, নতুন ধারার অর্থনীতির প্রবক্তা ও তত্বাবধায়ক , ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র শিক্ষক, প্রধান জনপ্রশাসক ও জনপ্রতিনিধি……সর্বোপরি তিনি রিসালাতের কঠিন ও মহান দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল।

তাঁর ঘরের পাশে অবস্থিত মসজিদে নববীই ছিলো উপরোল্লিখিত সবকিছুর হেডকোয়ার্টার।
উপরোক্ত পরিচয়ের বাইরে তার আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি স্বীয় স্ত্রীদের নিকট একজন শ্রেষ্ঠ ‘স্বামী’।

রাষ্ট্রের যাবতীয় দায়িত্ব, বিপদ-আপদ, আক্রমণ-প্রতিরক্ষা, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা, জনকল্যাণ ইত্যাদি ছাড়াও ব্যক্তি জীবনের দুর্বিষহ অভাব অনটনের বোঝা তাঁর একক মস্তিষ্কে বহন করতে হয়েছে সারাটি ক্ষণ।

মানসিকভাবে বহুমুখী অস্থিরতা স্বত্বেও একজন স্বামী হিসেবে তিনি যখন ঘরে ফিরতেন তখন স্ত্রীর নিকট নিজেকে পরিপাটি করে উপস্থাপন করতে কখনোই ভুলতেন না!! ঘরে ঢুকেই তিনি প্রথম মিসওয়াক হাতে নিতেন অথচ কিছুক্ষণ আগে মসজিদে যাওয়ার সময় তিনি মিসওয়াক করেই ঘর থেকে বের হয়েছেন।

স্ত্রীর ভালোলাগা ও নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষায় তিনি কতোটা তৎপর ছিলেন এ থেকে সহজেই অনুমেয়। হিসাব করলে দেখা যায় অন্যান্য সময় ব্যতিরেকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে মসজিদে যাওয়ার সময় এবং ফিরে এসে তিনি মোট ১০ বার মিসওয়াক করতেন! আবারও বলছি ১০ বার!!! এত্তো ব্যস্ততা স্বত্বেও রুটিনমাফিক এই ছোট্ট কাজটি করতে যিনি কখনোই ভুলতেন না, ভাবতে পারেন তিনি কতোটা সচেতন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ এবং স্মার্ট স্বামী ছিলেন!

নারীরাও এই মানবীয় ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ নারী এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। স্ত্রীদের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সৃষ্টিগতভাবে পুরুষরা একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের।

তাই স্বামীর মনোরঞ্জন, ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম উম্মাহর বিদুষী জননী আয়েশা (রাঃ) তাঁর নিজ ঘরে মিসওয়াক করতেন।(বুখারীঃ৪২৫৩)

মিসওয়াক নিয়ে হাদিসঃ

মুখগহ্বরের সুস্থতা দাম্পত্য জীবনের ঘনিষ্ঠতায় বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাছাড়া সামাজিকভাবেও নিজের ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

মিসওয়াক করা সম্পর্কে হাদিস

কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আলেমসমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ  রাসূলের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আমলের ব্যাপারে বড়োই উদাসীন।

অথচ রাসূল (সাঃ) মিসওয়াক করাকে এতোটাই গুরুত্বারোপ যা অন কোনো সুন্নাতের ক্ষেত্রে কখনও করেননি। তিনি বলেনঃ   لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلاَةٍ.

অর্থঃ “আমার উম্মাতের জন্য বা তিনি বলেছেন, লোকদের জন্য যদি কঠিন মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক সালাতের সাথে তাদের মিস্ওয়াক করার হুকুম করতাম”। (বুখারীঃ৮৮৭)

 

মিসওয়াক করার দোয়া বাংলা উচ্চারণঃ

মিসওয়াক করার দোয়া

বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মায আল সিওয়াকি হাজা মাহি ছললিজুনুবী ওয়ামারদ্বতাল লাকা ওয়াবায়্য়্যিজ্ব বিহি অযহি কামা বায়্য়্যাজ্বতা আসনানী ।

মিসওয়াক করার দোয়া বাংলা অর্থঃ

অর্থ : হে আল্লাহ এই মেসওয়াক করাকে আমার পাপ মোচনকারি ও তোমার রেজামন্দীর ওছিলা বানাও ।

মেসওয়াক সমন্ধে হাদিসঃ

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় মৃত্যুর কিছুক্ষণ পূর্বে রাসূল (সাঃ) মিসওয়াক করেই তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। গল্পটা আয়েশা রাঃ এর মুখেই শুনুনঃ

 

মিসওয়াকের ঘটনাঃ

 

“আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) নবী (সঃ)-এর কাছে এলেন। তখন আমি নবী (সাঃ) কে আমার বুকে হেলান দেয়া অবস্থায় রেখেছিলাম এবং আবদুর রহমানের হাতে তাজা মিসওয়াকের ডাল ছিল যা দিয়ে সে দাঁত পরিষ্কার করছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার দিকে (মিসওয়াক পাওয়ার আশায়) তাকালেন। আমি মিসওয়াকটি নিলাম এবং তা চিবিয়ে নরম করলাম। তারপর তা নবী (সাঃ)-কে দিলাম। তখন নবী  (সাঃ) তা দিয়ে দাঁত মর্দন করলেন।

আমি তাঁকে এর পূর্বে এত সুন্দরভাবে মিসওয়াক করতে আর কখনও দেখিনি। মিসওয়াক শেষ করেই রসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর উভয় হাত অথবা আঙ্গুল উপরে উঠিয়ে তিনবার বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে ( অর্থাৎ আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই)। তারপর তিনি  ইন্তিকাল করলেন…”। (বুখারীঃ৪৪৩৮)

আল্লাহর নিকট মুখের পরিচ্ছন্নতা কতটা কতটা প্রিয় তা জানতেন বলেই  মৃত্যুর সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেও তিনি মিসওয়াক করেছেন!! এই হাদীসটির মর্ম উপলব্ধি করতে গভীর চিন্তাশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই!

প্রতিটি মানুষের মুখে বিভিন্ন ধরণের জীবাণু থাকে। মুখ গহ্বরের থুথু, দাঁত, দাঁতে আটকে থাকা প্লাকে এসব জীবাণু বাস করে। জনগোষ্ঠী ও তাদের খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুখে বিভিন্ন প্রকার ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। গবেষণায় কয়েকটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ১০০ জন মানুষের মুখে ৪০০ প্রকার ব্যাকটেরিয়ায় অস্তিত্ব পাওয়া গেছে!!

মানুষ রাতে ব্রাশ না করলে সে ২৫০ প্রকারের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে ঘুমাতে যায়! অপর এক গবেষণায় বলা হয়েছে পৃথিবীর ৩৫-৪৫% মানুষের মুখ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এজন্য আমেরিকায় প্রতি বছর কেবলমাত্র মুখ গহ্বরের ফ্রেশনেসের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রসাধনী বিক্রি হয়।

এছাড়াও মুখ গহ্বরের অপরিচ্ছন্নতা মুখের ও দাঁতের বহু রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রাকটিসিং মুসলিমের সংখ্যা বর্তমানে নিতান্তই কম। যারা আবার প্রাকটিসিং তাদের খুবই কম সংখ্যক মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহটি আমল করে। তাই আসুন ব্রাশ-পেস্ট ব্যবহারের পাশাপাশি প্রিয় রাসূলের প্রিয় এই সুন্নাহটি পুনরুজ্জীবিত করি এবং সুস্থ থাকি।

আপনার জন্য আরো কিছু গুরুত্বপুর্ণ লেখা

লেখকঃ
হাফেজ মাওলানা দীদার মাহদী
ভাইস প্রিন্সিপ্যাল,
দারুলহুদা মডেল মাদরাসা
কোদালপুর, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর ৷