যে গোনাহ আমল নামায় লেখা হয় না

মাওলানা দিদার মাহাদী

1 158

 

 

যে গোনাহ আমলনামায় লেখা হয় না

মানুষ মাত্রই ভুল করে ৷ কিন্তু সেরা মানুষ হলো সে ব্যক্তি যে ভুলের ওপর অবিচল থাকে না ৷ বরং ফিরে আসে ৷ ভুলের স্বীকৃতি দেয় ৷ তাওবা করে ৷ মাফ চায় ৷ আর আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে গোনাহ করার পর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চায়।

পাপ হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেউ যদি কৃত পাপের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে ফেরেশতারা ঐ পাপ লেখেন না, বরং ছেড়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন :

إنّ صاحِبَ الشِّمالِ لَيَرْفَعُ القَلَمَ سِتَّ ساعات عنِ العَبْدِ المُسْلِمِ المخْطِىءِ فإنْ نَدِمَ واسْتَغْفَرَ الله مِنْها ألقاها وَإلَّا كُتِبَت وَاحِدَةً

‘‘কোন গুনাহগার মুসলিম বান্দা কোন গুনাহ করে ফেলার পর ডান কাঁধের ফেরেশতা ছয় ঘণ্টা গুনাহ লেখা থেকে কলম উঠিয়ে রাখে (অর্থাৎ গুনাহ লেখে না)। যদি সে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে গুনাহ থেকে ক্ষমা চায় তাহলে ফেরেশতা গুনাহটি না লিখে ছুঁড়ে ফেলে দেন, অন্যথায় একটি গুনাহ লেখা হয়।’’
[সহীহ আল জামি‘ : ২০৯৭, হাদীসটি সহীহ; সিলসিলাহ সহীহাহ্ : ১২০৯।]

তাছাড়া বিশেষ বিশেষ ‘ইবাদাতের শেষে ইস্তিগফার করার বিধান রয়েছে। হাদীসে এসেছে, সাওবান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا انْصَرَفَ مِنْ صَلَاتِهِ اسْتَغْفَرَ ثَلَاثً

রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সলাত শেষ করতেন তখন তিনবার ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আল ওয়ালীদ তার শিক্ষক আল আওযা‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে ইস্তিগফার করতে হয়? তিনি বললেন, ‘‘আস্তাগফিরুল্লাহ’’ বলা।

[সহীহ মুসলিম : ১৩৬২]

পাপ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। মহান আল্লাহ বলেছেন :

وَمَنْ يَّعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَه ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ يَجِدِ اللهَ غَفُورًا رَّحِيمًا

‘‘আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি যুল্ম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’’ [সূরা আন্ নিসা ১১০]

তিনি আরো বলেছেন :

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلٰى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ

‘‘আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজেদের প্রতি যুল্ম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তার উপর অটল থাকে না।’’ [সূরা আল ‘ইমরান ১৩৫]

মুমিন ব্যক্তির ভুল হয়ে গেলে সে তাওবা করে ক্ষমা চায় ৷ এটাই তার মহৎ গুণ ৷

গুনাহ না লেখার কারণ কী?

মুমিন ব্যক্তি পাপ করার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে। এ জন্য ফেরেশতারা পাপ কাজ সংঘটিত হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ যদি তার কৃত পাপের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে ফেরেশতারা ওই পাপ তার আমলনামায় লেখেন না, বরং ছেড়ে দেন।

- Advertisement -

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, পাপ করার সঙ্গে সঙ্গে দেরি না করে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি। কেননা পাপ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চাওয়া মুমিন ব্যক্তির অন্যতম গুণ। আর পাপ করার পর নির্ধারিত সময়ে ক্ষমা প্রার্থনায় সে পাপ আমলনামায়ও লেখা হয় না বরং মুছে ফেলা হয়।

গোনাহ মুক্ত জীবন লাভে সব সময় ছোট ছোট বাক্যের এ ইসতেগফারের মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া যায়। বিশ্বনবি একই মজলিশে এটি ১০০ বার পড়তেন। তাহলো-

رَبِّ اغْفِرْلِىْ وَتُبْ عَلَىَّ انَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْم

উচ্চারণ : ‘রাব্বিগফিরলি ওয়াতুব আলাইয়্যা ইন্নাকা আংতাত তাওয়্যাবুর রাহিম।’

অর্থ : ‘হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা কর। আমার তাওবা কবুল কর। নিশ্চয় তুমি অতিশয় তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)

গতানুগতিকভাবে শুধু গদবাধা তাওবার বাক্য পাঠ করলেই তাওবাহ্ করা হয় না। তাওবাহ্ করা মানে ফিরে আসা। তাই তাওবাহ্ করতে হবে খাঁটি, বিশুদ্ধ ও সত্যিকারের তাওবাহ্। মহান আল্লাহ বান্দাকে সত্যিকারের তাওবাহ্ করতে বলেছেন,

﴿يٰۤاَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللهِ تَوْبَةً نَصُوحًا﴾

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ্ কর, খাঁটি তাওবা।’’ [সূরা আত্ তাহরীম ৮]

‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) ‘‘তাওবাতুন্ নাসূহ’’-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে যে,

اَلتَّوْبَةُ النَّصُوْحُ أَنْ يَّتُوْبَ مِنَ الذَّنْبِ ، ثُمَّ لَا يَعُوْدُ إِلَيْهِ ، كَمَا لَا يَعُوْدُ اللَّبَنُ فِى الضَّرْعِ

‘‘তাওবাতুন্ নাসূহ’’ হলো গুনাহ থেকে এভাবে ফিরে আসা যাতে আর কখনো সেদিকে ফিরে না যায় যেমনিভাবে দুধ দোহন করার পর আর তা ফিরিয়ে দেয়া যায় না।’’

কৃত গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত হয়ে তার জন্য লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করে যে তাওবাহ্ করা হয় তাকেই ‘‘তাওবাতুন্ নাসূহ’’ বা সত্যিকারের তাওবাহ্ বা খাঁটি তাওবাহ্ বলে।

আল্লাহ আমাদের গোনাহমুক্ত জীবন গড়ার তাওফিক দিক ৷ ভুল হয়ে গেলে অতিদ্রুত তাওবা নসীব করুন ৷ আমীন ৷

লেখকঃ
দীদার মাহদী
ভাইস প্রিন্সিপ্যাল
দারুলহুদা মডেল মাদরাসা
কোদালপুর, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর ৷

- Advertisement -