শেষ বসন্তের গল্প

লেখা - শংকর চৌধুরী

0 56

শেষ বসন্তের গল্প

শংকর চৌধুরী

 

দাদু যাত্রামোহন। পুরো নাম যাত্রামোহন চট্টোপাধ্যায়। পাড়ার নাতী-নাতনীরা আদর করে যাত্রা নামটা বাদ দিয়ে মোহন দাদু বলে ডাকত। মোহন দাদুও ভীষণ রসিক ছিল নাতী-নাতনীদের কাছে। তাই রাস্তা দিয়ে বের হলেই এরা থাকতো পিঁছু পিঁছু।

তবে দাদু ছিল চিরকুমার। যৌবনে কত পাত্রী ঠিক করেছিল তার বাবা-মা, দাদু কিন্তু বিবাহে অসম্মতি জানিয়েছে সবসময়। এ নিয়ে পিতা যতীন্দ্রমোহন খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ তাদের একমাত্র ছিলেন সন্তান মোহন দাদু। তাদের সব আশা-ভরসা ছাঁই হলো। এ ভাবে কেটে গেলো বহু বছর।

এখন পিতা-মাতা সবাই লোকান্তরিত হলো। মোহন দাদুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতাও শেষ। বয়স তো কম হয়নি। হাফসেঞ্চুরী পার করেছে একযুগ হলো। কিন্তু বয়স যেন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এ বয়সেও দাদু অসম্ভব রকম শরীরচর্চা করে প্রতিদিন। যৌবনের ছাপ যেনো এখনো বুড়োর শরীর জুড়ে। চুলে কিছুটা পাকন ধরলেও দাদু তাতে কালি লাগায় প্রতি সপ্তাহে। আর দন্তপাটি এখনো পরিচ্ছন্ন। একটু সেজেগুজে চললে হা হা করে পাড়ার রমণীরা  তাকিয়ে থাকে। এজন্য দাদুর এক নাতী রবিন দাদুর নাম দিল রমণীমোহন।

নাতী-নাতনীরা মোহন দাদুর সাথে কত ঠাট্টা মসকরা করে। দাদুও তাদের নিয়ে দারুণ উপভোগ করে। কিন্তু দুষ্ট নাতী-নাতনীরা মোহন দাদুকে একটা প্রশ্ন বহুদিন ধরে করছে। কিন্তু দাদু তাদের কোন উত্তর না দিয়ে খোশগল্পে মেতে থাকে প্রত্যহ। দুষ্ট নাতীদের মধ্যে রবিন খুবই চালাক ও নাছোড়বান্দা। সে পণ করেছে আজ, যে করেই হোক দাদুর মনের কথাটা বলতেই হবে। নয়তো তার বন্ধুদের নিয়ে দাদুর সঙ্গ ত্যাগ করবে।

আরো পড়ুন –স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হলে করণীয়

যেই কথা, সেই কাজ। বিকালে পুকুরঘাটে দাদু। হাতে “ঠাকুরমার ঝুলি” বইটি নিয়ে এলো। কিন্তু নাতী-নাতনীরা সবাই চুপ। কারও মুখ থেকে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। মোহন দাদু তো মহা বিপাকে পড়লেন। নাতী-নাতনীরাই তো তার সংসার। এরা যদি এভাবে অনশন করে তাহলে তার কি গতি হবে। দাদু এবার বললেন, কি দাদু ভাইরা তোদের মৌনব্রতের রহস্যতো বুঝতে পারলুম না। তোরাই তো আমার সবকিছুরে। তোদের ছাড়া আমি বাঁচি কিভাবে। বল তোদের কি সমস্যা? আমি সব সমস্যাই দূর করব। একবার শুধু বল। পিচ্ছিদের মধ্যে এবার যেন আশা-ভরসা কিঞ্চিত সঞ্চার হলো। দুষ্টমতি রবিন আর দেরী না করে সাথে সাথেই বলে দিলো তাদের একমাত্র প্রশ্ন: দাদু তুমি বিয়ে করনি কেন? এর উত্তর আজকে দিতেই হবে। নইলে আজকে থেকে তোমার সাথে আমরা থাকবো না।দাদুর তো মাথায় হাত। এতো যেন শনির দশা লাগলো। কিন্তু নিস্তার নেই। বলতেই হবে। কারণ তিনি তো নাতীদের চক্রব্যুহ না বুঝেই তাদের কথা দিয়ে ফেললেন। এবার তো বলতেই হবে সব।

মোহন দাদু বললেন আচ্ছা শোন। তোদের যখন এতই আগ্রহ মনোযোগ দিয়ে শোন।

সে অনেক আগের কথা। আমি তখন টগবগে যুবক। একাদশ শ্রেণীতে পড়ি। খুবই সুদর্শন ছিলুম। শান্তিকুঞ্জ গ্রাম দিয়ে হেঁটেই দু কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যেতাম। পথিমধ্যে মালিপাড়ায় বাসন্তীবালা নামে এক ষোড়শী রমণীর দেখা হতো। সে তখন মেট্রিক পরীক্ষা দিবে। বাবা ছিলেন হতদরিদ্র। অতিকষ্টে জীবন চলতো তাদের।

এভাবে বেশ কিছুদিন অতিক্রান্ত হলো। একদিন কলেজে যাওয়ার সময় পথে আচমকা বৃষ্টি শুরু হলো। সাথে প্রচন্ড বজ্রপাত। উপায়ন্তার না দেখে দৌড়াতে দৌড়াতে বাসন্তীদের ঘরের সামনে আটচালাতে দাড়ালাম। ছোট্ট কুটির থেকে বাসন্তী দেখে আমাকে ঘরে নিয়ে গেলেন। শরীর অনেকটা ভিজে শীতল হয়ে গেলো। বাসন্তি একখানা গামছা দিল শরীর মুছতে। সাধ্যমত সেবাযতœ করলো এই হতভাগী। তার মাও প্রচুর খাতির করলো, যা কখনো ভুলার নয়।

সেই থেকে বাসন্তীর প্রতি নিরেট ভালোবাসা জন্ম নিলো অন্তরে। প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে তাকে না দেখলেই মনটা বিষন্ন থাকতো। বাসন্তীও আমার আগমনের প্রত্যাশায় প্রত্যহ অপেক্ষা করতো তীর্থের কাকের মতো।

এভাবে বছর দুয়েক পার হলো। আমি তখন  উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলাম। বাসন্তী মেট্রিক পাস করলো। আমার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরী হলো। দুর্ভাগ্যবশত ঐ বৎসর অজানা রোগে বাসন্তীর বাপও ইহলোক ত্যাগ করলো। পিতৃহীন একমাত্র কন্যার উপর সংসারের ভার এসে পড়লো। সংসার মানে মা মেয়ে। কিন্তু এ দুজনের অন্নের ভার বহনও কঠিন হয়ে পড়লো অবলা বাসন্তীর। বাড়ীতে যে কজন ছেলেমেয়ে পড়াতো তা দিয়ে সে নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতো। এখন তো বাড়তি দায়িত্ব। নুন আনতে পানতা ফুরায়। এহেন সংকটে সে সরনাপন্ন হলো নিকটস্থ এক পিশাত ভাইয়ের গৃহে। পিশাত ভাই এখন মস্ত বড়লোক। কিন্তু বাসন্তীর কথায় কর্ণপাত করলো না সে। তাছাড়া অভাগা যে দিকে যায়, সেখানে সাগর শুকায়। রিক্ত হস্তে বাড়ী ফিরলো কুমারী এখন সে বাড়ী বাড়ী গিয়ে টিউশনি করতে লাগলো এবং বাড়ীতেও পড়াতো। এভাবে কোন রকমে অভাব অনটনে কাটতে লাগলো।

এদিকে আমার মা-বাবা আমার বিয়ে ঠিক করলেন আমাকে না জানিয়ে। জমিদার বাড়ীর কন্যা। আমাকে বলতেই আমি এক রকম বললাম ‘না’, এ বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। কারণ আমি একটি মেয়েকে হৃদয় দিয়েছি। তাকে কিভাবে ভুলতে পারি, আর ভুললেই হবে সেটা জঘন্য বেঈমানি। তখন পিতাকে আমি বাসন্তীর কথা বললাম। বাবা তো রেগেমেগে রুদ্রমুর্তি ধারণ করলো। সাফ জানিয়ে দিলো, ঐ মালিনীর মেয়ের সাথে বিবাহ আমি কখনো মেনে নেব না। প্রয়োজনে আমি ত্যজ্যপুত্র করবো। মা কিছুটা আমার পক্ষ নিলেও বাবার ধমকে সেও নুয়ে গেলো।

অন্তর্দহণে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। বাসন্তীকে সবকথা জানালাম। সেও আমার কথাশুনে নির্বাক হয়ে গেলো।

এদিকে তার মাও তাকে বিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করলো এবং অনেক ভালো পাত্রও আসলো এই সুশ্রী রমণীর জন্য। কিন্তু সে পণ করে বসলো আমাকে ছাড়া কাউকে জীবনসঙ্গী করবেনা। এভাবে কেটে গেলো চারদশক। পিতা-মাতা লোকান্তরিত হলো।

এতক্ষণ  ধরে গভীর মনোযোগ দিয়ে দাদুর কথাগুলো শুনছিলো নাতি-নাতনীরা। খানিকটা মনে তারা কষ্ট পেল দাদুর অব্যক্ত দুঃখ জেনে। কিন্তু নাতনিরাতো এবার দাদুকে আরও ঝাপটে ধরলো। রবিন দাদুকে বললো, দাদু এত কষ্ট বুকে চেপে কিভাবে রাখলে তুমি। আমরা ছোট হলেও অনেক কিছু করতে পারি। এই কথা বলে নাতিরা সবাই চলে গেলো। নাতীরা সব বুদ্ধি করলো কাল সকালে তারা শান্তিকুঞ্জ মালিপাড়ায় যাবে। পরদিন সকালে সবাই দলবেঁধে উপস্থিত হলো দাদুর বাড়ীর থেকে দু কিলোমিটার দূরে শান্তিকুঞ্জের সে বাড়ীতে। বাসন্তীবালা এখন মধ্যবয়স্কা রমণী। বারান্দায় একঝাঁক ছেলেমেয়ে পড়াচ্ছে। আর এদিকে একঝাঁক ছেলে-মেয়ে বাড়ীতে আসতে দেখে বাসন্তীর মা বলল, মা বাসন্তি তোর কাছে, অনেক ছাত্র পড়তে এলো। একটু বের হয়ে দেখ। তখন নাতীদের সর্দ্দার রবিন বলল, আমরা পড়তে আসিনি, আমরা আসছি বাসন্তী দিদিমনির সাথে আমাদের মোহনদাদুর বিয়ের কথা বলতে। একথা শুনে বুড়িতো হতবাক। আর বাসন্তীবালাও ছাত্রদের ছুটি দিয়ে দিলেন। বিশ^াসই করতে পারলেন না বাচ্চাদের মুখে যাত্রামোহনের এখনো চিরকুমার থাকার কথা। চোখে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো আবেগাপ্লুত বাসন্তীবালার। ভাবলেন মনে মনে ভালোবাসার তাহলে কোন মৃত্যু নেই। নাতীরা সবাই বসে বাসন্তী দিদিমণি ও তার ৮০ বৎসরের বৃদ্ধা মায়ের সাথে কথা পাকা করে ফেলল। রবিন বলল মোহন দাদু ও বাসন্তী দিদিমণিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে না পারলে আমরা দাদুর বাড়ীতে যাবো না শপথ করেছি। এদিকে বাসন্তীবালা এটুকু বাচ্চাদের কান্ড দেখে বিস্মিত। বাসন্তী ভাবলেন গোপালভাঁড়ের নাতি-নাতনীদের কিসসা শুনছিনা তো। পাত্রপক্ষে একঝাঁক নাতি-নাতনী ও পাত্রীপক্ষে বৃদ্ধার সম্মতিতে মোহনদাদুর সাথে বাসন্তীবালার বিয়ে ঠিক হলো। অতপর এরা পন্ডিতমশাইয়ের কাছ থেকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে বাড়িতে আসলো পড়ন্ত বিকেলে।

বিকাল বেলা মোহনদাদুর কাছে নাতিরা সব একত্রিত হলো। দাদু বলল কিহে দাদুরা তোদের মতলবটা কি শুনি? নাতিদের মধ্যে রবিন ও গোপী বলল, দাদু তোমার বিয়ে একদম পাকা করে এসেছি। শ্রাবণমাসের ২৫ তারিখ শুভদিন। নাতিদের কথা শুনে দাদুতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে। ভাবলেন কি বলে পিচ্চি ছেলেমেয়েগুলো। তখনি রবিন সবকথা দাদুকে খুলে বলল। দাদুরও চোখে আনন্দের অশ্রæ বয়ে গেলো এ বয়সে কাঙ্খিত মনের মানুষকে কাছে পাওয়ার আনন্দেও বার্তায়। ষাটোর্ধ্ব দাদু বললেন আমার সুখের জন্য, আমর একাকিত্বের কষ্ট লাঘবের জন্য তোদের এতো পরিকল্পনা দেখে আমি তো অবাক । আবার খুশিতেও আটখানা হলো। যেই কথা নাতিদের সেই কাজ। রবিন বললো, এখন আর বসে থাকা চলবেনা। সময় খুব কম হাতে। মোহন দাদুর বিয়ের আয়োজন যত তাড়াতাড়ি করতে পারি তত উত্তম। কারণ সময় মাত্র পনের দিন বাকী। নাতি-নাতনীরা একেকজন একেকটা দায়িত্ব নিলো। কেউ কেউ বর-কন্যার কাপড়চোপড়, প্রসাধনী কিনবে, আবার কেউ কেউ বাড়ী-ঘর সাজাবে, কয়েকজন নিলো খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্ব। দিন-রাত খেটে বিয়ের আয়োজন করতে লাগলো। আর মাত্র দুুদিন বাকী। এলাকার গণ্যমাণ্য সবাইকে মোহনদাদুর বিয়েতে নিমন্ত্রণ করলো। সব আয়োজন সম্পূর্ণ হলো। অবশেষে এলো সে মাহেন্দ্রক্ষণ। শুভলগ্নে নাতিরা দাদুকে সাজিয়ে এবং নাতনীরা বাসন্তীদিদিমণিকে সাজিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসালো। এই বৃদ্ধ বয়সেও যেন বর-কন্যা সেই যৌবন ফিরে পেলো। ভালোবাসার পূর্ণতা পেল শুভ পরিনয়ের মাঝে। এদিকে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত নাতিরাও সব সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করলো। মহানন্দে অতিথিরাও পেটপুরে খেয়ে নববিবাহিত বর-কন্যাকে আর্শিবাদ করে চলে গেল। পালকী চড়ে বধুয়া বাসন্তী কাঁদতে কাঁদতে চললো শ^শুরবাড়ী।

 

 

- Advertisement -