হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত মাওলানা শরিফ আহমাদ

হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

196

হজ্জ করার নিয়ম । হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

 

সুপ্রিয় পাঠক বন্ধুগণ । আসছে হজ্জের মৌসুম । প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছেন হাজীগণ । কাগজপত্র রেডি, অর্থ যোগান এবং নিয়মকানুন শেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকে । তাই আজ আপনাদেরকে হজ্জের সমস্ত নিয়মকানুন সম্পর্কে জানাবো ।‌ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত ৷ বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ । পোস্টটি হজ্জ গমনে ইচ্ছুক ভাই-বোনদের জন্য লেখা হলেও সকলে উপকৃত হতে পারবেন । এমন করেই লেখাটিকে সাজানো হয়েছে । সুতরাং পড়া শুরু করুন ।

 

হজ্জ অর্থ কি ?

 

হজ্জ একটি আরবী শব্দ । শব্দটির অর্থ হল সংকল্প করা , ইচ্ছা করা ইত্যাদি ।

 

 

হজ্জ কাকে বলে ?

 

শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জ বলা হয় নির্দিষ্ট মাসে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে কতগুলি কাজ শরীয়ত নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী আঞ্জাম দেওয়াকে ।

 

হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম । আর ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি হলো হজ্জ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত ।

১. কালিমা- لا اله الا الله محمد رسول الله

( আল্লাহ তাআলা ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত আর কোন মাবুদ নেই । হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার রাসুল ‌‌)

২. নামাজ কায়েম করা ।

৩.যাকাত দেওয়া ।

৪. হজ্জ আদায় করা ।

৫. রমজান মাসে রোজা রাখা ।

 

 

এই হাদীস অনুযায়ী ইসলামের পাঁচ ভিত্তি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত । ১. ইতিকাদ বা বিশ্বাস ২. আমল বা ইবাদত । ইতিকাদ হচ্ছে অন্তরে কালিমার বিশ্বাস এবং মুখে তার স্বীকৃতি প্রদান করা । আমল আবার তিন ভাগে বিভক্ত । ১. শারীরিক ইবাদত যেমন নামাজ ও রোজা । ২.আর্থিক ইবাদত যেমন যাকাত প্রদান । ৩. শরীর ও অর্থ উভয়ের সম্বলিত ইবাদত যেমন হজ্জ ।

 

কাজেই হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক । হজ্ব অস্বীকারকারী নিঃসন্দেহে কাফের ।

 

হজ্জ সম্পর্কিত আয়াত

 

১.  সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর হজ্ব ফরজ ।

فِیۡہِ اٰیٰتٌۢ بَیِّنٰتٌ مَّقَامُ اِبۡرٰہِیۡمَ ۬ۚ وَمَنۡ دَخَلَہٗ کَانَ اٰمِنًا ؕ وَلِلّٰہِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الۡبَیۡتِ مَنِ اسۡتَطَاعَ اِلَیۡہِ سَبِیۡلًا ؕ وَمَنۡ کَفَرَ فَاِنَّ اللّٰہَ غَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
অনুবাদ: এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না।
(আল ইমরান – ৯৭)

২. মানুষের মাঝে হজ্জের ঘোষণা ।
وَاَذِّنۡ فِی النَّاسِ بِالۡحَجِّ یَاۡتُوۡکَ رِجَالًا وَّعَلٰی کُلِّ ضَامِرٍ یَّاۡتِیۡنَ مِنۡ کُلِّ فَجٍّ عَمِیۡقٍ ۙ

অনুবাদ: এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। (আল হাজ্জ্ব – ২৭)

৩. হজ ও ওমরা পালনের বিধি-বিধান ।
وَاَتِمُّوا الۡحَجَّ وَالۡعُمۡرَۃَ لِلّٰہِ ؕ  فَاِنۡ اُحۡصِرۡتُمۡ فَمَا اسۡتَیۡسَرَ مِنَ الۡہَدۡیِ ۚ  وَلَا تَحۡلِقُوۡا رُءُوۡسَکُمۡ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡہَدۡیُ مَحِلَّہٗ ؕ  فَمَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ بِہٖۤ اَذًی مِّنۡ رَّاۡسِہٖ فَفِدۡیَۃٌ مِّنۡ صِیَامٍ اَوۡ صَدَقَۃٍ اَوۡ نُسُکٍ ۚ  فَاِذَاۤ اَمِنۡتُمۡ ٝ  فَمَنۡ تَمَتَّعَ بِالۡعُمۡرَۃِ اِلَی الۡحَجِّ فَمَا اسۡتَیۡسَرَ مِنَ الۡہَدۡیِ ۚ  فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ فِی الۡحَجِّ وَسَبۡعَۃٍ اِذَا رَجَعۡتُمۡ ؕ  تِلۡکَ عَشَرَۃٌ کَامِلَۃٌ ؕ  ذٰلِکَ لِمَنۡ لَّمۡ یَکُنۡ اَہۡلُہٗ حَاضِرِی الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ  وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٪

অনুবাদ: আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর।

এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন। (আল বাকারা – ১৯৬)

৪. ইহরাম অবস্থায় স্বীকার করা জায়েজ নেই ।
اُحِلَّ لَکُمۡ صَیۡدُ الۡبَحۡرِ وَطَعَامُہٗ مَتَاعًا لَّکُمۡ وَلِلسَّیَّارَۃِ ۚ وَحُرِّمَ عَلَیۡکُمۡ صَیۡدُ الۡبَرِّ مَا دُمۡتُمۡ حُرُمًا ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡۤ اِلَیۡہِ تُحۡشَرُوۡنَ
(আল মায়িদাহ – ৯৬)

তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সুমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে এবং তোমাদের এহরামকারীদের জন্যে হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ এহরাম অবস্থায় থাক। আল্লাহকে ভয় কর, যার কাছে তোমরা একত্রিত হবে।

৫. সাফা ও মারওয়া সায়ী করা ।
اِنَّ الصَّفَا وَالۡمَرۡوَۃَ مِنۡ شَعَآئِرِ اللّٰہِ ۚ فَمَنۡ حَجَّ الۡبَیۡتَ اَوِ اعۡتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِ اَنۡ یَّطَّوَّفَ بِہِمَا ؕ وَمَنۡ تَطَوَّعَ خَیۡرًا ۙ فَاِنَّ اللّٰہَ شَاکِرٌ عَلِیۡمٌ

অনুবাদ: নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন। (আল বাকারা – ১৫৮)

৬. হজ্ব মৌসুমী ও ব্যবসা-বাণিজ্য করা জায়েজ ।
لَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ جُنَاحٌ اَنۡ تَبۡتَغُوۡا فَضۡلًا مِّنۡ رَّبِّکُمۡ ؕ فَاِذَاۤ اَفَضۡتُمۡ مِّنۡ عَرَفٰتٍ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ عِنۡدَ الۡمَشۡعَرِ الۡحَرَامِ ۪ وَاذۡکُرُوۡہُ کَمَا ہَدٰىکُمۡ ۚ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ مِّنۡ قَبۡلِہٖ لَمِنَ الضَّآلِّیۡنَ

অনুবাদ: তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষন করায় কোন পাপ নেই। অতঃপর যখন তওয়াফের জন্য ফিরে আসবে আরাফাত থেকে, তখন মাশ‘ আরে-হারামের নিকটে আল্লাহকে স্মরণ কর। আর তাঁকে স্মরণ কর তেমনি করে, যেমন তোমাদিগকে হেদায়েত করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে তোমরা ছিলে অজ্ঞ। (আল বাকারা – ১৯৮)

আরও পড়ুনঃ দোয়া কুনুত কী ও কেনো? 

৭. বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করার নির্দেশ ।
ثُمَّ لۡیَقۡضُوۡا تَفَثَہُمۡ وَلۡیُوۡفُوۡا نُذُوۡرَہُمۡ وَلۡیَطَّوَّفُوۡا بِالۡبَیۡتِ الۡعَتِیۡقِ

অনুবাদ: এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে। (আল হাজ্জ্ব – ২৯)

হজ্জ করার ফজিলত

১ নং হাদীস

عن ابي هريره رضي الله تعالى عنه قال: سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: من من حج لله فلم يرفث ولم يفسق رجع  كيوم ولدته امه
হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন অশ্লীল কথা বা গোনাহের কাজে লিপ্ত না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হজ সম্পন্ন করল সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসলো । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২১)

২ নং হাদীস
عن ابي هريره رضي الله تعالى عنه قال: سؤل النبي صلى الله عليه وسلم اي الاعمال افضل قال: ايمان بالله ورسوله قيل: ثم ماذا قال جهاد في سبيل الله قيل: ثم ماذا قال حج مبرور
হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো সর্বাধিক উত্তম আমল কোনটি ? তিনি বললেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করা । পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো এরপর কোনটি ? তিনি বললেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা । পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো এরপর কোনটি? তিনি বললেন হজ্জে মাবরুর করা । ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫১৯)

৩ নং হাদীস
عن ابي هريره رضي الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: العمرة الى العمرة كفارة لما بينهما والحج المبرور ليس له جزاء الا الجنه .
হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,এক উমরা আদায়ের পর পরবর্তী ওমরা আদায় করা মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের জন্য কাফফারা স্বরূপ । আর মাকবুল হজ্বের পুরস্কার হলো জান্নাত । ( সহীহ বুখারী,১৭৭৩)

৪ নং হাদীস
হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হজ ও ওমরা কারীগণ হলে আল্লাহর দাওয়াতি যাত্রীদল । যদি তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করেন তবে তিনি তা কবুল করেন । আর যদি তার নিকট প্রার্থনা করে তাহলে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন ।
(ইবনে মাজাহ সূত্রে মেশকাত পৃষ্ঠা নং ২২৩ )

৫ নং হাদীস
হযরত জাবের রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন আমার মসজিদে নামাজ আদায় করা মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদের চেয়ে এক হাজার গুন উত্তম। আর মসজিদে হারামে নামাজ আদায় করা অন্যান্যদের চেয়ে এক লক্ষ গুণ উত্তম ।
( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৯০, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৪০৬ মেশকাত, হাদীস নং ৬৯২)

হজ্জ না করার শাস্তি

 

হযরত আবূ উমামা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যা প্রচণ্ড অভাব নেই জালিম বাদশা তাকে( হজ্জ করতে) বাধাও দেয়নি এবং সে গুরুতর অসুস্থ ও নয় এমতাবস্থায় সে যদি হজ্জ না করে মারা যায় তাহলে সেই ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক অথবা না নাসারা হয়ে মৃত্যুবরণ করুক( তাতে আমার কিছু আসে যায় না ‌) ( সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৬৯)

হজ্জের ইতিহাস

 

হজ্জের বিধান হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম থেকে চলে আসছে । যেদিন বায়তুল্লাহর ভিত্তি রাখা হয়েছে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তাওয়াফ ও জিয়ারত । কোনদিন বন্ধ হয়নি এবং বন্ধ হবে ও না । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে এ ঘর বহুবার ধ্বংস হয়েছে এবং তা পুনঃ নির্মাণ করা হয়েছে । হযরত নূহ আলাইহিস সালামের প্লাবনের সময় এর কোন চিহ্ন ও ছিল না । আল্লাহ তাআলা হযরত জিব্রাইল আমিনের মাধ্যমে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে এ স্থান চিহ্নিত করে দিলে তিনি আল্লাহর নির্দেশে তা পুনঃ নির্মাণ করেন । এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে বললেন তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা করে দাও ‌।
وَاَذِّنۡ فِی النَّاسِ بِالۡحَجِّ یَاۡتُوۡکَ رِجَالًا وَّعَلٰی کُلِّ ضَامِرٍ یَّاۡتِیۡنَ مِنۡ کُلِّ فَجٍّ عَمِیۡقٍ ۙ
অনুবাদ: এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। (আল হাজ্জ্ব – ২৭)

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন হে খোদা জনমানবহীন এই প্রান্তরে কে আমার আহ্বান শুনবে ? এরপর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মাকামে ইব্রাহিমের দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন কোন কোন বর্ণনায়  আছে তিনি আবু কুবাইস পাহাড়ে আরোহণ করে দুই কানে আঙুল রেখে ডানে-বামে, পূর্ব-পশ্চিম, মুখ করে বললেন, লোকসকল তোমাদের পালনকর্তা নিজ গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন । তোমরা সকলে পালনকর্তা আদেশ পালন করো ।
তাফসীর ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আহবান আকাশে বাতাসে, পাহাড়ে প্রান্তরে সর্বত্র ধ্বনিত হয় ।

আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আওয়াজ বিশ্বের কোনে কোনে পৌঁছে দেন এবং শুধু তখনকার জীবিত মানুষ পর্যন্ত নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে আলমে আরওয়াহে তাদের কাছে পৌঁছে দেন।

সেদিন সে আহবানে যারা লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছিল তারা একদিন না একদিন লাব্বাইক বলতে বলতে আরাফার ময়দানে হাজির হবে এবং হজ্ব করবে । যারা দুনিয়া থেকে লাব্বাইক বলেছে ,যারা মায়ের পেট থেকে লাব্বাইক বলেছে, যারা আলমে আরওয়াহে রুহের জগত থেকে লাব্বাইক বলেছে, তারা সকলেই হজ করবে । যে যে কয়বার লাব্বাইক বলেছে সে সে কয়বার হজ্ব করবে । ( তাফসীর ইবনে কাসীর,খুতবাতু হাকীমুল ইসলাম )

 

 

কার উপর হজ্জ ফরজ ?

 

যার নিকট পবিত্র মক্কা থেকে হজ্জ করে ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের আবশ্যকীয় খরচ বাদে মক্কা শরীফ যাতায়াতের মোটামুটি খরচ পরিমাণ অর্থ থাকে তার উপর হজ্জ ফরজ । ব্যবসায়িক পণ্য এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমির মূল্য এ অর্থের হিসেবে গণ্য করতে হবে ।

 

হজ্জ করার বয়স

 

নাবালক সন্তানের উপর হজ্জ ফরজ হয় না । নাবালেক অবস্থায় হজ্জ করলেও বালেগ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সামর্থ্য হলে পুনরায় হজ্জ‌ করতে হবে ।

 

অন্ধের ওপর হজ্জ ফরজ নয় যত সম্পদ থাকুক না কেন ।

 

মহিলাদের জন্য নিজ স্বামী বা নিজের কোন বিশ্বস্ত দ্বীনদার মাহরাম পুরুষ ব্যতীত হজ্বে যাওয়া দুরস্ত নয় ‌। শুধু এমন কোন মহিলা থাকা যথেষ্ঠ নয় যার সাথে তার মাহরাম পুরুষ রয়েছে ।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বৃদ্ধকালে হজ্ব করতে যায় । অথচ যৌবন কাল হচ্ছে ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময় । এই সময়ে হজ্ব আদায় করা অনেকটা সহজ হয়ে যায় । তাছাড়া হজ্ব ফরজ হওয়ার পর দেরি করাও ঠিক নয় ।

 

হজ্জ কত প্রকার

 

হজ্জ তিন প্রকার :

১. ইফরাদ

২. তামাত্তু

৩. কিরান ।

 

হজ্জের পরিচয়

 

১. ইফরাদ: ইফরাদ একটি আরবী শব্দ। শব্দটির অর্থ হলো একক, অদ্বিতীয়, আলাদা করণ, পৃথক হওয়া ইত্যাদি।

হজ্জের মাসে কেবলমাত্র হজ্জের নিয়তে এই ইহরাম বেঁধে হজ্জ করাকে হজ্জে ইফরাদ বলে । এরূপ হাজীকে বলা হয় মুফরিদ ।

 

২. তামাত্তু: তামাত্তু একটি আরবী শব্দ। শব্দটির অর্থ হলো উপভোগ করা , আনন্দ লাভ করা, শান্তি পাওয়া, উপকৃত হওয়া ইত্যাদি। হজ্জের মাসে প্রথমে উমরাহর নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরা শেষ করে পুনরায় ৮ ই‌ জিলহজ মক্কা থেকে হজের ইহরাম বেঁধে হজ করাকে হজ্জে তামাত্তু বলে ।‌ এরূপ হাজী কে বলা হয় মুতামাত্তি ।

 

৩. কিরান: কিরান একটি আরবী শব্দ । সংযুক্ত করা ,একত্র করা , মিলিয়ে নেওয়া ইত্যাদি । একই ইহরামে হজ্জ্ব ও ওমরাহ একসাথে মিলিয়ে করাকে বলা হয় হজ্জে কিরান । এরূপ হাজী কে বলা হয় কারিন । এই তিন প্রকার হজের মধ্যে কিরান হজ উত্তম । কেননা এতে এক গ্রামে দীর্ঘদিন থাকতে হয় বলে কষ্ট বেশি হয় । নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনের শেষ হজ ছিল হজ্জে কিরান ।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে সে উপরোক্ত তিন প্রকার হতে যেকোনো একটি পালন করলে তার হজ্ব আদায় হয়ে যাবে । হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হজ্জে কিরান উত্তম । তবে হজ্জে তামাত্তু সহজ ।

 

 

হজ্জের ফরজ কয়টি ?

 

হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত
হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

হজ্জের প্রকৃত ফরজ তিনটি ।

১. ইহরাম বাঁধা । অর্থাৎ মনে মনে হজ্জের নিয়ত করে মনে মনে তালবিয়া পাঠ করা ।

২. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ‌। অর্থাৎ ৯ ই জিলহজ দ্বিপ্রহরের পর হতে ১০ ই জিলহজ সুবহে সাদিক পর্যন্ত যেকোনো সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ‌।

৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা অর্থাৎ যে তাওয়াফ ১০ ই জিলহজ্জের ভোর হতে ১২ জিলহজ পর্যন্ত যেকোনো দিন মাথার চুল মুন্ডানো বা ছাটার পরে করা হয় ।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

যদি এই ফরজ তিনটির কোন একটি ও বাদ পড়ে যায় তাহলে হজ্ব শুদ্ধ হবে না । এবং কোরবানি দ্বারা তার ক্ষতি পূরণ সম্ভব হবে না ‌।

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

হজ্জের ওয়াজিব সমূহ

 

হজ্জের প্রকৃত ওয়াজিব ৬ টি ।

১. মুজদালিফায় অবস্থান করা ।

২. সাফা ও মারওয়া নামক পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করা বা দৌড়ানো ।

৩. মিনার জামরা সমূহের উপর রমি করা অর্থাৎ কংকর নিক্ষেপ করা ।

৪. হজ্জে কিরান ও হজ্জে তামাত্তু সমাপন কারীর জন্য কোরবানি করা ।

৫. ইহরাম ভঙ্গ করার সময় মাথার চুল ছাঁটা বা মুন্ডানো ।

৬. বহিরাগতদের জন্য তাওয়াফে বিদা করা অর্থাৎ বিদায়কালীন তাওয়াফ সমাপন করা ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

ওয়াজিব সমূহের হুকুম এই যে যদি সেগুলোর কোনো একটি বাদ পড়ে যায় তবুও হজ্ব আদায় হয়ে যাবে । তা ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ‌ পড়ুক ভা ভুলক্রমে বাদ পড়ুক । তবে কোরবানী অথবা সদকা দ্বারা তার ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হবে ।

 

 

হজ্জের সুন্নাত সমূহ

 

হজ্জের অনেকগুলো সুন্নাত রয়েছে । নিম্নে তার কয়েকটি বর্ণনা করা হলো ।

১. মক্কার বাইরের লোকদের মধ্যে যারা হজ্জে ইফরাদ ও হজ্জে কিরান আদায় করেন তাদের জন্য তাওয়াফে কুদুম করা ।

২. ইমামের জন্য তিন জায়গায় খুতবা প্রদান করা । ৭ ই জিলহজ মক্কা মুকাররমায় ৯ ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে এবং ১১ জিলহজ্ব মিনায় ।

৩.৮ ই জিলহাজ সূর্যোদয়ের তারপর মিনার দিকে রওনা হওয়া ।

৪. আরাফার রাত্রি (৮ ই জিলহজ দিবাগত রাত্রি) মিনায় যাপন করা ।

৫. ৯ ই জিলহজ্জের সূর্যোদয়ের পর মিনা হতে আরাফার দিকে গমন করা ।‌

৬. আরাফায় গোসল করা ।

৭. আরাফা হতে প্রত্যাবর্তনের পথে মুজদালিফায় রাত্রি যাপন করা ।

৮. মিনা হতে প্রত্যাবর্তন কালে মুহাসসাব নামক স্থানে অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও যাত্রা বিরতি করা ।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

সুন্নাতের হুকুম এই যে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা দোষনীয় । পালন করলে সওয়াব হয় আর ছেড়ে দিলে কোন প্রকার ক্ষতি পূরণ ওয়াজিব ‌হয় না ।

 

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

ইহরাম কি ?

 

হজ্জ অথবা ওমরা কিংবা হজ ও ওমরাহ উভয়টির জন্য নিয়ত করে নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে তালবিয়া পাঠ করা এবং বাইতুল্লাহ শরীফের তওয়াফ ও সাফা- মারওয়া সায়ী করার পর মাথা মুন্ডন করে বা চুল ছোট করে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত অবস্থাকে ইহরাম বলে ‌।

 

কোথা থেকে ইহরাম বাঁধবেন ?

 

হজ্জ বা উমরার উদ্দশ্যে রওনা হলে মিকাত অর্থাৎ শরীয়ত কর্তৃক ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার পূর্বেই ইহরাম বেঁধে নেওয়া জরুরী ‌‌। বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তান প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলীয় লোকদের জন্য এই নির্ধারিত স্থানটি হল ইয়ালামলাম (মক্কা থেকে দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম ) সামুদ্রিক জাহাজ যোগে হজ যাত্রী গন স্থান বরাবর অতিক্রম করার পূর্বে অবশ্যই ইহরাম বেঁধে নিবেন । প্লেনে এ স্থান বরাবর কখন অতিক্রম করে তার টের পাওয়া বেশ কঠিন ।

 

তাই প্লেন যোগে হজ্ব ও উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা গমনের জন্য প্লেনে আরোহন এর পূর্বেই বেঁধে নেওয়া উচিত । বিমানবন্দরে যেয়ে বা হাজী ক্যাম্প থেকে বা বাসা থেকে রওনা হওয়ার পূর্বে বাসায় বা মসজিদে যেকোনো স্থানে বাধা যায় ।

 

যারা মদিনা শরীফ আগে যাওয়ার ইচ্ছা করবেন তারা বিনা ইহরামের রওয়ানা হবেন । মদিনা শরীফ থাকার পর যখন মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন তখন মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফ গমনকারীদের মীকাত যেহেতু যুলহুলাইফা তাই জুলহুলাইফা নামক স্থান (বর্তমানে বীরে আলী নামে পরিচিত) থেকে বা মদিনায় থেকে ইহরাম বেঁধে মক্কা শরিফ রওনা হবেন ।

 

যারা মক্কা শরীফে থেকে নফল ওমরা করতে চান ইহরাম বাঁধার জন্য তাদেরকে হারামের সীমানার বাইরে যেয়ে ইহরাম বেঁধে আসতে হবে । এর জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান হল তানয়ীম বর্তমানে সেখানে মসজিদে আয়েশা নামক একটি মসজিদ আছে । তাই মসজিদে আয়েশা গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে নফল ওমরা করবেন ‌। জেরানা নামক স্থান থেকেও ইহরাম বেঁধে আসা যায় ।

 

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

ইহরাম বাঁধার নিয়ম

 

ইহরাম বাঁধার ইরাদা হলে প্রথমে ক্ষৌরকার্য করে নিন। নখ কাটুন , বগল ও নাভির নিচের পশম পরিস্কার করুন। এগুলো মুস্তাহাব । মাথা মুন্ডানো অভ্যাস থাকলে মাথা মুন্ডায়ে নিন । অন্যথায় চুল আঁচড়ে নিন । স্ত্রী সম্ভোগ ও মোস্তাহাব ।

 

তারপরে ইহরামের নিয়তে গোসল করে নিন। না পারলেও অযু করে নিন । এটা সুন্নাত । ভালোভাবে শরীরের ময়লা দূর করবেন ।

 

তারপর সেলাইবিহীন ( ফাড়া )লুঙ্গি পরিধান করুন । অর্থাৎ একটা চাদর পরিধান করুন এবং একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিন । এখন ডান বগলের নীচ দিয়ে পরবেন না । এহরামের কাপড় সাদা রঙের হলে উত্তম। পুরুষের জন্য ইহরামের অবস্থায় শরীরের পরিমাপে সেলাই করা হয়েছে এমন কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ । মহিলাগণ যেকোনো পোশাক পরিধান করতে পারেন। ইহরামের কাপড় নতুন বা পরিষ্কার হওয়া উত্তম । তারপর সুগন্ধি লাগিয়ে নিন । এটা সুন্নত ।

 

তারপর ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিন । এটা সুন্নাত । এই দুই রাকাতের মধ্যে প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া উত্তম । এই নামাজ মাথায় টুপি সহকারে পড়তে হয় । নামাজের নিষিদ্ধ ওয়াক্তে ইহরামের নিয়ত করতে হলে নামাজ না পড়ে ইহরাম বাঁধতে হয়। নামাজের পর টুপি খুলে রেখে বা মাথা খালি করে কেবলা মুখী থেকেই ইহরামের নিয়ত করতে হবে । বসে বসে নিয়ত করা উত্তম এবং নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা উত্তম ।

 

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

ওমরা ইহরামের নিয়ত

 

ওমরার আরবী নিয়ত:

اللهم اني اريد العمرة فيسرها لي وتقبلها مني

ওমরার বাংলা নিয়ত:

হে আল্লাহ আমি উমরা করতে চাই । তুমি আমার জন্য তার সহজ করে দাও এবং কবুল করো ‌।

 

হজ্বের ইহরামের নিয়ত

 

হজ্বের ইহরামের আরবী নিয়ত :

اللهم اني اريد الحج فيسره لي وتقبله مني

হজ্জের ইহরামের বাংলা নিয়ত:

হে আল্লাহ আমি করতে চাই । তুমি আমার জন্য তা সহজ করে দাও এবং আমার থেকে তা কবুল করো ।

 

হজ্ব ও ওমরার একত্র ইহরামের নিয়ত

আরবী নিয়ত:

اللهم اني اريد الحج والعمرة فياسرهما لي وتقبل هما مني

বাংলা নিয়ত:

হে আল্লাহ আমি হজ্ব ও উমরা করার নিয়ত করছি তুমি সহজ করে দাও এবং কবুল করো ।

 

তারপর তালবিয়া পড়ুন । তালবিয়া পড়া সুন্নাত । তবে নিয়তের সাথে একবার তালবিয়া বা যে কোন জিকির থাকা শর্ত । তালবিয়া জোর আওয়াজে পড়া সুন্নাত। এবং তিনবার পড়া সুন্নাত । মহিলাদের জন্য তালবিয়া জোর আওয়াজে পরা নিষিদ্ধ । তারা এতোটুকু শব্দে পড়বে যেন নিজের কানে শোনা যায় । তালবিয়া আরবিতে পড়া উত্তম ।

 

তালবিয়া এই-

لبيك اللهم لبيك لبيك لا شريك لك لبيك ان الحمد والنعمة لك والملك لا شريك لك

তালবিয়া বাংলা উচ্চারণ:

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক , লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক , ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি মাতা লাকা ওয়াল মুলক , লা শারিকা লাক ।

তালবিয়ার অর্থ:

আমি হাজির হে আল্লাহ আমি হাজির । আমি হাজির কোন শরীক নাই তোমার আমি হাজির । নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমার । আর সকল সাম্রাজ্যও তোমার কোন শরীক নেই তোমার ।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

নিয়ত ও তালবিয়া পাঠ করার পর ইহরাম বাঁধা সম্পূর্ণ হয়ে গেল ।

ইহরাম বাধার পর দরুদ শরীফ পাঠ করুন বা যা ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহর কাছে যে কোন প্রার্থনা করুন । তবে এই দোয়াটি পাঠ করা উত্তম ।

اللهم اني اسالك رضاك والجنه واعوذ بك من غضبك والنار

অনুবাদ: হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট চাই তোমার সন্তুষ্টি এবং জান্নাত আর তোমার অসন্তোষ ও জাহান্নাম থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই ।

 

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

তবে মহিলাগণ হায়েজ-নেফাসের অবস্থায় থাকলে নামাজ না পড়ে শুধু নিয়ত করে এবং তালবিয়া পড়ে নিলে ইহরাম শুরু হয়ে যাবে ।

 

মহিলাদের ইহরাম করার নিয়ম

 

 

মহিলাদের ইহরাম ও পুরুষদের অনুরূপ । পার্থক্য শুধু এই যে মহিলাদের জন্য সেলাই যুক্ত কাপড় পরিধান করা উচিত এবং মাথা ঢেকে রাখা ওয়াজিব । শুধু মুখ খোলা রাখবে । কিন্তু বেগানা পুরুষদের সামনে বোরকার নেকাব বা সামনের পর্দা এমন করে ঝুলিয়ে দিবে যেন চেহারার সাথে না লাগে ।

 

মহিলাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় অলংকার মোজা, হাতমোজা ও রঙ্গিন কাপড় পরিধান করা জায়েজ ।

মহিলাদের জন্য জোরে তালবিয়া পাঠ করার নিষিদ্ধ । তবে শুধু নিজের শুনতে পায় এমন জোরে পাঠ করা ‌।

মহিলারা তাওয়াফের সময় কখনও ইজতেবা ও রমল করবে না । এমনকি সাঈ করার সময় ও সবুজ বাতি দুটির মধ্যবর্তী স্থানে দ্রুত গতিতে চলবে না । বরং নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে চলবে এবং যখন খুব কষ্ট হবে তখন সাফা ও মারওয়ার উপরে আরোহণ করবে না । এমনিভাবে পুরুষদের ভিড়ের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে যাবে না ।

 

মহিলাদের জন্য মাথা মুন্ডন করা নিষেধ । সুতরাং ইহরাম খোলার সময় চুলের ঝুঁটি ধরে তার অগ্রভাগ হতে আংগুলের এক কড় পরিমাণ চুলন নিজের হাতে কেটে ফেলতে হবে । কোন বেগানা পুরুষ কে দিয়ে কাটানো নিষেধ ।

 

যদি ইহরামের পূর্বে হায়েজ দেখা দেয় তাহলে গোসল করে ইহরাম বাঁধবে । কিন্তু ইহরামের দু’রাকাত নামাজ পরবে না । হায়েজ অবস্থায় হজ ও ওমরার যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা জায়েজ । শুধু তাওয়াফ ও সায়ী করা নিষেধ । এগুলো পবিত্র হওয়ার পর সম্পন্ন করবে ‌।

 

যদি হায়েস জনিত কারণে যথাসময়ে তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করতে বিলম্ব হয় তবে দম ওয়াজিব হবে না ।

মক্কা মুকাররমা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় হায়েজ এসে গেলে বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব নয় ।

 

সফর অবস্থায় অধিকাংশ মহিলা পর্দার প্রতি কোনো গুরুত্ব আরোপ করে না । অন্যান্য দেশের মহিলারা বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করার কারণে পর্দানিশী মহিলারা তাদের দেখাদেখি বেপর্দা হয়ে যায় এবং হজ্জের সফরে বেপর্দা হয়ে যাওয়ার গুনাহে লিপ্ত হয় । মহিলাকে এবং তাদের চেয়ে তাদের অভিভাবকগণকে এ ব্যাপারে সচেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন । কেননা শরীয়ত বিরোধী কাজ করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যায় না ।

 

আপনি পড়ছেনঃ হজ্জ করার নিয়ম। হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

শিশুদের ইহরাম করার নিয়ম

 

যদি কোন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু চালাক ও বুদ্ধিমান বলে প্রতীয়মান হয় তবে সে নিজেই ইহরাম বেঁধে প্রাপ্তবয়স্কদের মত হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করবে । পক্ষান্তরে যদি সেই একান্ত আবু ঝ হয় তাহলে তার অভিভাবকগণ তার পক্ষ থেকে ইহরাম বাঁধবে ।

 

বুদ্ধিমান শিশু নিজে তাওয়াফ সম্পন্ন করবে । আর অবুঝ শিশুকে তার অভিভাবকগণ কোলে নিয়ে তাওয়াফ করাবে । উকুফে আরাফা , সাঈ ও রমি বা কংকর নিক্ষেপ প্রভৃতি কাজের হুকুমও একইরকম ।

 

শিশুকে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত রাখা অভিভাবকের কর্তব্য । কিন্তু যদি শিশু কোনো নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলে তবুও সে জন্য কোন অথবা সদকা- দম শিশুর বা অভিভাবকের উপর ওয়াজিব হবে না ।

 

যখন কোনো অবুঝ শিশুর পক্ষ হতে ইহহরাম বাধা হবে তখন তার দেহ থেকে হতে সেলাইযুক্ত কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং তাকে সেলাইবিহীন চাদর ও লুঙ্গি পরিয়ে দিতে হবে ।

 

শিশুর ওপর হজ ফরজ নয় । সুতরাং তার এই হজ্ব নফল বলে গণ্য হবে ।

 

ইহরাম অবস্থায় করণীয় কি ?

 

ইহরাম অবস্থায় অধিক পরিমাণে তালবিয়া পড়তে থাকা উত্তম । বিশেষত গাড়িতে উঠতে, গাড়ি থেকে নামতে, কোন উচ্চ স্থানে উঠতে ,নিচু স্থানে নামতে, প্রত্যেক নামাযের পর ইত্যাদি মুহূর্তে তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব । তালবিয়া পুরুষগণ জোর আওয়াজে পড়বেন । তবে এত জোরে নয় যেন নিজের বা কোন নামাজী বা ঘুমন্ত ব্যক্তির অসুবিধা হয়।

 

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ,প্রবেশের সময়, সাক্ষাতের সময় ,বিদায়ের সময় ,উঠতে বসতে, সকাল-সন্ধ্যায় মোটকথা যেকোনোভাবে অবস্থার পরিবর্তন হলে সে সময়ে তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব ।

 

তালবিয়ার স্থলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বাক্যগুলো বলা যায় । তবে তালবিয়া শব্দগুলো হলো সুন্নাত ।

 

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ

 

পুরুষের জন্য শরীরের পরিমাণে বানানো হয়েছে এমন সেলাই যুক্ত পোশাক নিষিদ্ধ । যেমন জামা, পায়জামা, জাংগিয়া , টুপি গেঞ্জি ,সোয়েটার ইত্যাদি । মহিলাদের জন্য হাত মোজা ,পা মোজা ,অলংকার পরিধান করা যায় তবে না করা উত্তম । ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত পুরুষের জন্য মাথা ও চেহারা এবং মহিলাদের জন্য শুধু চেহারা ঢাকা নিষিদ্ধ । মহিলাদের জন্য মাথা ঢেকে রাখা ওয়াজিব । পুরুষগণ কান ও গলা ঢাকতে পারবেন ।

 

এমন জুতো স্যান্ডেল পরিধান করা নিষিদ্ধ যাতে পায়ের মধ্যবর্তী উঁচু ঢাকা পড়ে যায় । মহিলারা জুতা পরিধান করতে পারেন ।

 

সর্বপ্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ । সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ । নখ চুল ও পশম কাটা ও কাটানো নিষিদ্ধ ।

 

স্থলভাগের প্রাণী শিকার করা বা বসে কাজে কোন রুপ সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ । তবে মশা-মাছি ছারপোকা সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি কষ্টদায়ক প্রাণীকে মারা যায় ।

স্ত্রী সহবাস বা এর সম্পর্কিত কোনো আলোচনা চুমু দেওয়া এবং শাহওয়াত উত্তেজনা) সহকারে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ।

ঝগড়া-বিবাদ করা বা কোন গোনাহের কাজ করা নিষিদ্ধ । এগুলো এমনিতেই নিষিদ্ধ ।ইহারামের অবস্থায় আরো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । উকুন মারাও নিষিদ্ধ।

 

হজ্জ করার সঠিক নিয়ম

হজ্জে ইফরাদ, তামাত্তু বা কিরান যাই হোক হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা প্রায় একই রকম । হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ইহরাম বাধার মাধ্যমে । ইহরাম ঘর থেকে বা এয়ারপোর্ট থেকে বাঁধলে সুবিধা হয় । তা না হলে মীকাত অতিক্রম করার আগে অবশ্যই ইহরাম বাঁধতে হবে । ইহরামের নিয়মগুলো পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ।
নির্ধারিত সময়ে মক্কা শরীফে পৌঁছে প্রথমে কাবা ঘরের তাওয়াফ করবেন । এটাকে বলা হয় তাওয়াফে কুদুম । এটা ইফরাদ ও কিরান হজ্ব আদায়কারীর জন্য এটা সুন্নাত । তামাত্তু আদায়কারীর জন্য ফরজ ।‌ এ তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের দুই রাকাত ওয়াজিব তাওয়াফ নামাজ পড়ে তামাত্তু সাফা- মারওয়া সায়ী করে হালাল হয়ে যাবে । আর হজ্জে ইফরাদ হজ্জে কিরান যারা করবে তারা চায় করলে করতে পারে তবে উত্তম হলো তাওয়াফে জিয়ারত করার পর সাঈ করবে এরপর অপেক্ষায় থাকবে ৮ ই জিলহজ্জের ।
৮ ই জিলহজ থেকে মূলত হজ্বের কার্যক্রম শুরু । ৮ তারিখে ইহরাম অবস্থায় তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনায় যাওয়া । সেখানে যোহর ,আসর ,মাগরিব ,এশা ও ফজর পড়া ।‌ ৯ ই জিলহজ ফজর পড়ে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া । সেখানে যোহর ও আসর পড়া এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া দরুদ ও তালবিয়া পাঠ ব্যস্ত থাকা । এটাকে বলা হয় উকুফে আরাফা । অর্থাৎ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা । এটা হজ্জের অন্যতম একটা ফরজ । সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া । মুজদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশার এক আযান ও এক ইকামতে আদায় করা । রাতে অবস্থান করা এখান থেকে ৭০ টি কংকর সংগ্রহ করা । যা অনায়াসে মাটিতে হাত দিলেই পাওয়া যায় । ফজরের নামাজ পড়ে একটু ফর্সা হলে মুজদালিফা ত্যাগ করে আবার মিনায় আসা । মিনায় এসে আজকে অর্থাৎ ১০ ই জিলহজ শুধু বড় শয়তানকে ৭ টি কংকর নিক্ষেপ করা । এরপর যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে কোরবানি করে হলক বা কসর করা হালাল হয়ে যাবে । তারপর তাওয়াফে জিয়ারত উদ্দেশ্যে আবার মক্কায় ফিরে আসবে । এবং যথারীতি তাওয়াফে জিয়ারত শেষে ( সাঈ পূর্বে করে না থাকলে ) সাঈ করে আবার ১১ জিলহজ্ব মিনায় উদ্দেশ্যে যাওয়া । সেখানে পরপর তিন শয়তানকে কংকর মেরে মিনা রাত্রি যাপন করা । পরের দিন ১২ ই জিলহাজ সূর্য হেলার পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আবার তিন শয়তানকে পাথর মেরে মক্কায় ফিরে আসলে হজ্ব সম্পন্ন হয়ে যায় । এরপর শুধু বাকি থাকে বিদায়ী তাওয়াফ । বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব ‌। হাজী যখন দেশে ফিরে আসবে বা মদিনায় চলে যাবে এরপর আর মক্কায় ফিরবে না ঠিক এমন সময় একটা তাওয়াফ করবে । এরপর কোনো সাঈ নাই । এটা হল হাজির সর্বশেষ কাজ । এর মাধ্যমে তার হজ পরিপূর্ণ হবে ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : হজ্ব সম্পাদন করার আগে কিংবা হজ্ব সম্পাদন করে মদীনায় যাওয়া ‌ প্রকৃত আশিকে রাসূলের পরিচয় এবং অধিক সওয়াব লাভের বড় একটি মাধ্যম । এই সুযোগ যেন কারো হাত ছাড়া না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা ।

লিখেছেন: মাওলানা শরিফ আহমাদ
ঢাকা , বাংলাদেশ ।

 

ফেসবুকে আমাদের সাথে যুক্ত হতে ক্লিক করুন ৷

- Advertisement -