হিজরী নববর্ষ ১৪৪২ | ইতিহাস ও শিক্ষা | দীদার মাহদী | শীর্ষবার্তা

0 99

দীদার মাহদী ||

সবাইকে আরবি নতুন বছরের শুভেচ্ছা ও দুআ ৷
জীবন সময়ের সমষ্টি। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির সময় তার আয়ু নির্ধারিত করে দেন। মানুষের বয়স যত বাড়ে, নির্ধারিত আয়ু ততটুকু কমে। নেক আমল, দান–খয়রাত, পিতা–মাতার খেদমত, গুরুভক্তি এবং আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সেবা আয়ু বৃদ্ধির করে। আল্লাহ তাআলা সময়কে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন অংশে বিভাজন করেছেন। যেমন দিন, রাত, সপ্তাহ, পক্ষ, মাস, বছর ইত্যাদি।

আরবি বছরের আরো একটি সন অতিবাহিত হলো ৷ আমাদের জীবন থেকে আরো একটি বছর চলে গেলো ৷ বিদায় নিলো ইসলামি আরবি বছর ১৪৪১। স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪২ হিজরি।

বছর বা বর্ষকে সাল, সন, অব্দ ইত্যাদি বলা হয়। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনের সময়কাল হলো সৌরবর্ষ এবং পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের আবর্তনের সময়কাল হলো চান্দ্রবর্ষ। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন,
اَلشَّمۡسُ وَ الۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ ﴿۪۵﴾
সূর্য ও চাঁদ (নির্ধারিত) হিসাব অনুযায়ী চলে ৷
(সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ৫)।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর হিজরতের বছরকে ইসলামি সন গণনার প্রথম বছর ধরা হয়েছে বলে এটি হিজরি সন নামে পরিচিত। হিজরি সন চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষ—উভয় হিসেবে গণনা করা হয়। সৌর হিসাবে ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ দিনে মাস ও ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে বছর হয়; চান্দ্র হিসাবে ২৯, ৩০ দিনে মাস ও ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে বছর হয়। ইসলামি শরিয়তের ফিকহি বিধানগুলোতে মাস বলতে চান্দ্রমাস এবং বছর বলতে চান্দ্রবর্ষকেই বোঝায়।

মুসলিম বিশ্বে ও ইসলামে হিজরি সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ হিজরি সন এমন একটি সন, যার সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তামাদ্দুন ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত।

মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, শবেবরাত, শবেকদর, শবে মেরাজসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ হিজরি সনের অনুসারী।

ইসলামি আরবি বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবীজির হিজরতের স্মৃতি, তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে হিজরি সাল একসময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আজকাল তা কেবল রমজান ও ঈদের হিসাব রাখার মধ্যে সীমিত হয়ে আছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হিজরি সনের পহেলা মাস মহররম একের পর এক আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয় ঠিক, কিন্তু হিজরি সনের শুভাগমন উপলক্ষে হইচই নেই, নেই কোনো প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন মিডিয়ার বিশেষ কোনো আয়োজন।

যেমনভাবে বিশেষ আয়োজন পরিলক্ষিত ইংরেজি নববর্ষের আগমনে। বাংলা এবং ইংরেজি নববর্ষকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপন করা হয়, তাতে মনে হয় হিজরি নববর্ষের যেন আমাদের কোনো প্রয়োজনই নেই!

অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্বসহকারে পালন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য। হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্ময়রণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে।

রাসূল (সা.) এবং তার সাথীবর্গের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়েছিল।
আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসূল (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের হিজরত থেকেই হিজরি সনের সূচনা।

হিজরি সনের সূচনা: খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হলে অফিসিয়াল তথ্যাদির নথি ও দিনক্ষণের হিসাব রাখতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা বিপাকে ও অসুবিধায় পড়েন।

যেহেতু তখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ষপঞ্জি বা একক সন চালু ছিল না। রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল কার্যাদি যথানিয়মে সম্পন্ন করার প্রয়োজনে নতুন সন প্রবর্তন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর ফারুক (রা.) এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মূসা আশআরি (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একদা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা উমরের (রা.) খেদমতে এ মর্মে পত্র লিখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সম্বলিত যেসব চিঠি আমাদের নিকট পৌঁছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোনো চিঠি কোন দিনের তা নিরুপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না।

এতে করে আমাদেরকে নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে।

হজরত আবু মুসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত উমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহবান করেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে।

উক্ত পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলীসহ (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সকলের পরামর্শ ও মাতামতের ভিত্তিতে এ সভায় ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়।

কেউ মত পোষণ করে রাসুল (সা.) এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন রাসুলের (সা.) ইন্তেকালের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক।

কারো কারো মতে হুজুর (সা.) এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। কেউ বললেন নবী (সা.)এর নবুয়ত প্রকাশের বছর থেকে বর্ষগণনা শুরু করা যায়।

এভাবে বিভিন্ন মতামত আলোচিত হওয়ার পর হজরত উমর (রা.) বললেন, নবী (সা.) এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না।

কারণ খ্রিস্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের মাস থেকেই খিস্ট্রাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসুলের জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে বাহ্যত খ্রিস্টানদের অনুসরণ ও সাদৃশ্যতা হয়ে যায়, যা মুসলমানদের জন্য পরিতাজ্য।

আর অপরদিকে নবীজীর (সা.) ওফাত দিবসের মাস থেকেও গণনা শুরু করা যাবে না, কারণ এতে প্রিয় নবীজীর (সা.) এর মৃত্যুব্যথা আমাদের মাঝে বারবার উত্থিত হবে। পাশাপাশি অজ্ঞ যুগের মৃত্যুর শোক পালনের ইসলাম বিরোধী একটি কুপ্রথারই পুনরুজ্জীবন ঘটবে।

হজরত উমর (রা.) এর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যকে হজরত উসমান (রা.), হজরত আলী (রা.) একবাক্যে সহমত পোষণ করেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে মহানবী (সা.) এর হিজরতের ঘটনাকে মহিমান্বিত করার জন্য মহররম মাস থেকে হিজরি নামে একটি স্বতন্ত্র সন চালু করার ঘোষণা দেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.)।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হিজরী সনের মাস সমূহ মুসলমানদের জীবনধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে।

ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: ইসলামে হিজরী সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
আল্লাহপাক এরশাদ করেন,
اِنَّ عِدَّۃَ الشُّہُوۡرِ عِنۡدَ اللّٰہِ اثۡنَا عَشَرَ شَہۡرًا فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ یَوۡمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ مِنۡہَاۤ اَرۡبَعَۃٌ حُرُمٌ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ۬ۙ فَلَا تَظۡلِمُوۡا فِیۡہِنَّ اَنۡفُسَکُمۡ وَ قَاتِلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ کَآفَّۃً کَمَا یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ کَآفَّۃً ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۳۶﴾
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসেবের মাস হলো বারোটি। (মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানী, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানী, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ এবং জিলহজ) যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত। (সূরা তাওবাহ : ৩৬)।

১২ মাস হলো মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জুলকদ ও জুলহজ। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। (তাফসিরে বাগাভি ৪র্থ খ-, পৃষ্ঠা নং :৪৪)।

আর হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত এবং বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

কোরআন কারীমে এ মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘চারটি মাস রয়েছে যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম’।

এ আয়াতের চারটি সম্মানিত মাসকে চিহ্নিত করতে গিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং অপরটি হলো রজব। (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

কোরআনেও আরও এরশাদ হয়েছে,
یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡاَہِلَّۃِ ؕ قُلۡ ہِیَ مَوَاقِیۡتُ لِلنَّاسِ وَ الۡحَجِّ ؕ
﴿۱۸۹﴾
লোকেরা তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বলো ‘তা মানুষ ও হজ্বের জন্য সময় নির্দেশক।’ (সূরা বাকারা : ১৮৯)।

মহররম মাসেই সংঘঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক কারবালা। এ মাসে রয়েছে ফজিলতপূর্ণ ‘আশুরা’। মানবজাতির পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই নানা ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহ্য বহন করছে মহররম মাস। কাজেই মুসলিম উম্মাহর কাছে হিজরি সনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

বিশেষ করে হিজরি সনের সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে থাকার কারণে এই সনের তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক।
এই চাঁদের হিসাবে মুসলমানদের অনেক ইবাদত বন্দেগি, আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। কাজেই হিজরি তারিখকে গুরুত্ব দেয়া একান্ত জরুরি।

নতুন চাঁদ দেখে দুআ পড়ার কথা হাদীসে এসেছে ৷
طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا رَأَى الْهِلاَلَ قَالَ ‏ “‏ اللَّهُمَّ أَهْلِلْهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالإِيمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالإِسْلاَمِ رَبِّي وَرَبُّكَ اللَّهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ ‏.‏

ত্বালহা ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

নতুন চাঁদ দেখার পর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য চাঁদটিকে বারাকাতময় (নিরাপদ), ঈমান, নিরাপত্তা ও শান্তির বাহন করে উদিত করো। হে নতুন চাঁদ আল্লাহ তা’আলা আমারও প্রভু, তোমারও প্রভু।
হিজরি নববর্ষ ১৪৪২ বয়ে আনুক করোনামুক্ত পৃথিবীর এক নতুন পয়গাম। আগামীর দিন হোক সম্ভাবনাময় ৷ আখিরাতের পূজি সংগ্রহের ৷
লেখকঃ ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, দারুলহুদা মডেল মাদরাসা, কোদালপুর, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর ৷

- Advertisement -